ইউরোপের বাজারে চীনের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক আধিপত্য এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ প্রতিদিন ১০০ কোটি ইউরো ছাড়িয়ে গেছে। এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘ সময় ধরেই ব্রাসেলস এবং বেইজিংয়ের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে টিকে আছে। চীন থেকে ইইউতে পণ্য আমদানির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। ইউরোপীয় সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপের বাজারে চীনা পণ্যের অতিরিক্ত আধিপত্য নিয়ে ক্রমাগত উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তাদের বাজার চীনা পণ্যের জন্য অত্যন্ত সহজলভ্য হলেও চীনে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর অবাধ প্রবেশের পথ বেশ কঠিন। এই বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি দুই অঞ্চলের মধ্যকার বাণিজ্য ভারসাম্যকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ইউরোপীয় নীতি-নির্ধারকদের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, চীনের সঙ্গে এই কৌশলগত এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখে কীভাবে নিজেদের অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব, সেই ভারসাম্য রক্ষা করা। একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক উভয় পক্ষের যৌথ স্বার্থ রক্ষা করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে ওঠার কারণে বেইজিংয়ের কাছে ইউরোপের সাথে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই জটিল পরিস্থিতিতে বেইজিং তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং জানিয়েছেন, চীন আশা করছে ইউরোপীয় পক্ষ তাদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে সমস্যা সমাধানের পথে কাজ করবে। বেইজিং স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, তারা এই সংকটের সমাধানে ব্রাসেলসের কাছে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সংলাপ এবং গভীর সহযোগিতার আহ্বান জানাচ্ছে। চীনের এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, তারা কোনো অবস্থাতেই এই আলোচনাকে ইউরোপের একতরফা দাবির মুখে নতি স্বীকারের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে চায় না।
বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতাও শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর কূটনৈতিক উপদেষ্টা ইমানুয়েল বোন আগামী ৯ থেকে ১৩ অক্টোবর চীন সফর করবেন। এই সফর দুই পক্ষের মধ্যকার বাণিজ্য উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে বিরল খনিজ রপ্তানির ক্ষেত্রে চীনের সাম্প্রতিক কড়াকড়ি এবং সার্বিক বাণিজ্যিক অস্থিরতার বিষয়ে এখানে আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্প্রতি চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাওর সঙ্গে বৈঠক করতে চীন সফর করেছেন ইইউয়ের বাণিজ্যবিষয়ক কমিশনার মারোস সেফকোভিচ। বিষয়টি নিয়ে বিগত তিন মাস ধরে চলতে থাকা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ধারাবাহিকতায় মারোস সেফকোভিচের এ সফর।
ইউরোপের বাজার ব্যবস্থা এবং চীনা অর্থনীতির মধ্যকার এই অমিল দূর করা এবং সমমর্যাদার সংলাপের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা সম্ভব কি না, তা এখন উভয় পক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর ওপর নির্ভর করছে। মডার্ন ডিপ্লোমেসি সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে, উভয় পক্ষই এখন সংকট নিরসনে একটি টেকসই পথ খোঁজার চেষ্টা করছে।

















