জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটিতে বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছে। ২১৭ সদস্যের পূর্বের কমিটি ভেঙে তা ১৯৬ সদস্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। নতুন এই কমিটিতে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সদস্য সচিব আখতার হোসেন তাদের পূর্বের পদে বহাল থাকলেও সাংগঠনিক কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। পার্টির পক্ষ থেকে মুখ্য সংগঠক, মুখ্য সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে গঠন করা হয়েছে সাংগঠনিক সম্পাদকসহ নতুন কিছু সম্পাদকীয় পদ। এখন এনসিপি ওইসব পদ বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কমিটি পুনর্গঠনের ফলে এনসিপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার পদাবনতি ঘটেছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখা সামান্তা শারমিন এতদিন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তবে নতুন কমিটিতে তাকে কেবল যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি তাকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘রাজনৈতিক পরিষদ’ থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব থেকে নাহিদা সারোয়ার নিভাকে নতুন কমিটিতে যুগ্ম সদস্য সচিব পদে অবনমন করা হয়েছে। সামান্তা শারমিন আরও লেখেন, সর্বজ্ঞানী ও মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বিভিন্নভাবে বান্দাকে পাপমুক্ত করেন অথবা পরীক্ষা করেন। পোস্টের শেষে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও হেদায়েত প্রার্থনা করে সামান্তা শারমিন লেখেন, ‘আল্লাহ আমাদের মাফ করেন, হেদায়েত দান করেন।
দলের পক্ষ থেকে এসব পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, নেতাদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পারফরম্যান্স মূল্যায়ন এবং বিলুপ্ত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর সমন্বয় করতেই এই রদবদল করা হয়েছে। বিশেষ করে, আগে যেসব প্রভাবশালী নেতা মুখ্য সমন্বয়ক বা মুখপাত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন, তাদের বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামোয় স্থান দিতে গিয়েই অন্যদের পদমর্যাদায় এই পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, আরিফুল ইসলাম আদীবের ক্ষেত্রেও পদাবনতির গুঞ্জন উঠেছে। পূর্বের কমিটিতে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে থাকা আদীবকে নতুন কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে, যদিও দলের রাজনৈতিক পরিষদে তার আগের অবস্থান বহাল রয়েছে। এ বিষয়ে আরিফুল ইসলাম আদীব জানান, এটি পদাবনতি নয়, বরং সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তন। তিনি বলেন, ‘ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নায়কদের জন্য আগে বিভিন্ন ফরম্যাটে দায়িত্ব ছিল, এখন সেগুলো বিলুপ্ত করা হয়েছে। তাদেরকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সিনিয়র সদস্য সচিবের পদ দেওয়া হয়েছে। আমি সাংগঠনিক কাঠামোতে আগেও ৮ নম্বর অবস্থানে ছিলাম, এখনো সেখানেই আছি।’ আমি আমার পারিবারিক জীবন সম্পূর্ণ আলোচ্যসূচির বাইরে রাখার পক্ষে, সেজন্যই আগের পোস্টে বলিনি। এ বিষয়ে আরিফুল ইসলাম আদিবের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে তিনি জানান, এটা আসলে পদাবনতি না। এখনও ৮ নম্বরে আছি।
সামান্তা শারমিনের পদাবনতির পেছনে রাজনৈতিক ইস্যুর পাশাপাশি ব্যক্তিগত কারণও থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এনসিপি ও জামায়াতের জোট ইস্যুতে তার দ্বিমত থাকার বিষয়টি বিভিন্ন মহলে আলোচিত। এছাড়া, পরিবারের অসুস্থতা নিয়েও তিনি বেশ সংকটে আছেন। গত ২০ সেপ্টেম্বর নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, তার স্বামীর অসুস্থতার কারণে চিকিৎসার প্রয়োজনে তাকে দীর্ঘ সময় দিতে হচ্ছে। একজন কর্মঠ ও উদ্যমী মানুষ হিসেবে গত তিন মাস ধরে স্বামীর এমন অসুস্থতা তাকে মানসিকভাবে কষ্ট দিচ্ছে এবং সংগঠনের কাজে সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন। দ্বিতীয়টি হচ্ছে তিনি পরিবারকে বেশি সময় দিচ্ছেন। কিছুদিন আগে তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তার স্বামী অসুস্থ তার চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাতে হচ্ছে। স্বামীর অসুস্থতার কারণে মানসিক কষ্টের কথাও তুলে ধরেন সামান্তা। তিনি বলেন, একজন উদ্যমী, কর্মঠ ও তরুণ মানুষকে গত তিন মাস ধরে এভাবে নিস্প্রভ হয়ে যেতে দেখা অনেক যন্ত্রণার।
অন্যদিকে, আরিফুল ইসলাম আদীবের রাজনৈতিক অবস্থান বর্তমানে কিছুটা চাপের মুখে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। গত নির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসন থেকে পরাজিত হওয়ার পর তিনি ঢাকা উত্তরে এনসিপির মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে আলোচিত ছিলেন। তবে সম্প্রতি দলীয়ভাবে প্রার্থী পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে, যেখানে এখন আসিফ মাহমুদের নাম উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে এনসিপির এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। উত্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন আসিফ মাহমুদ।
















