পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিং মান সম্প্রতি দিল্লি বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ভাই মণীশ কুমারকে দায়ী করেছেন। শুক্রবার রাজ্য বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী জানান, ফ্রান্সের প্যারিস থেকে ফেরার পথে দিল্লি বিমানবন্দরে তাকে অহেতুক দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়। এ সময় তার ব্যক্তিগত মালামাল তল্লাশি করা হয় এবং তাকে ৫০ হাজার রুপি জরিমানার চালান দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, এই পুরো প্রক্রিয়ার দায়িত্বে ছিলেন দিল্লি শুল্ক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত আইআরএস কর্মকর্তা মণীশ কুমার। তিনি একে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার একটি কৌশল হিসেবে অভিহিত করেন। তল্লাশি শেষে কিছুই না পাওয়ায় তাঁরা আমাকে যেতে দেন। রাজনৈতিক দিক থেকে কংগ্রেসও আপের প্রতিপক্ষ।
মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিং মান বিস্তারিত বর্ণনায় বলেন, শুল্ক বিভাগের কর্মীরা বারবার তার মালামাল তল্লাশি করার ওপর জোর দিচ্ছিলেন। তল্লাশির পর কোনো অসংগতি না পেলেও, বের হওয়ার সময় কর্মকর্তারা জানান যে ওপর মহল থেকে কঠোর চাপ রয়েছে, তাই জরিমানা করতেই হবে। শেষ পর্যন্ত ৫০ হাজার রুপি জরিমানা ধার্য করা হয়। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পাঞ্জাব বিধানসভায় সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের কাজকর্ম এবং ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) সংক্রান্ত কার্যক্রমের ওপর স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। অনেক সদস্য এই আলোচনার সময় সিইসির পদত্যাগ দাবি করেছেন। তবে প্রস্তাবটি পাসের সময় কংগ্রেস, শিরোমনি অকালি দল ও বিজেপির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন না। এ সময়েই বিজেপির উদ্দেশে মান বলেন, ‘এভাবেই ওরা প্রতিশোধ নেয়। মুখ্যমন্ত্রীর বরং জানানো উচিত কী কারণে শুল্ক বিভাগ তাঁকে ৫০ হাজার রুপি জরিমানা করেছে। যখন বেরোচ্ছি, তখনই সেই কর্মকর্তারা আবার এসে বলেন, ওপর মহল থেকে তাঁদের ওপর খুব চাপ রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর এই অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক অনিল সারিন পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বলেন, মুখ্যমন্ত্রী তার নিজস্ব দায় এড়াতে এই অভিযোগ তুলছেন। তিনি বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রীদের কিছু বিশেষ সুবিধা থাকলেও তাদের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের মালামাল তল্লাশিমুক্ত নয়। সারিন মুখ্যমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, কেন তাকে জরিমানা করা হয়েছে, সেই কাগজটি প্রকাশ্যে আনলেই আসল সত্য বেরিয়ে আসবে। বিজেপি নেতা আরও দাবি করেন, প্রটোকল অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী বা তার সঙ্গীরা সবসময় তল্লাশির ঊর্ধ্বে নন।
উল্লেখ্য, পাঞ্জাবের আপ সরকারের সঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও মুখ্যমন্ত্রী মানকে বেশ কয়েকবার কেন্দ্রীয় বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। প্যারিসের ‘এসআইএএল প্যারিস ২০২৬’ খাদ্যমেলায় যোগ দেওয়ার অনুমতি নিয়েও কেন্দ্র তাকে ছাড় দিতে রাজি ছিল না। শেষ পর্যন্ত পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের নির্দেশে ১৭ থেকে ২১ অক্টোবর তিনি প্যারিস সফর করেন, যেখানে তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী গুরপ্রীত কৌর। বিদেশ সফরের চরিত্রসহ নানা বিষয় বিবেচনা করে কেন্দ্র ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ ইস্যু করে।
বিধানসভার ওই অধিবেশনে মুখ্যমন্ত্রী মান পাকিস্তানের পাঞ্জাবি কবি বাবা বসির হুসেন নাজমি কর্তৃক লাহোরে বিশ্ব পাঞ্জাবি সম্মেলনে আমন্ত্রণের প্রসঙ্গটিও টেনে আনেন। আগামী ২৭ নভেম্বর ওই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। মান প্রশ্ন তোলেন, তাকে যদি ফ্রান্স সফরের অনুমতি পেতে বেগ পেতে হয়, তবে পাকিস্তান যাওয়ার অনুমতি পাওয়া কতটা কঠিন হবে। তিনি বলেন, দুই দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি এক। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার যেন অন্য কবি ও লেখকদের পাকিস্তানে যাওয়ার অনুমতি দেয়। অথচ এ দেশ থেকে বহু পাঞ্জাবি কবি ও লেখক পাকিস্তান যাবেন।
নিজের বক্তৃতার শেষভাগে তিনি কারতারপুর করিডর নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, তিনি চান সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলের সদস্যরাও যেন কারতারপুর সাহেব দর্শন করতে যান। শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক দেব জীবনের শেষ ১৮ বছর কারতারপুরে কাটিয়েছিলেন। ভারতীয় পাঞ্জাবের গুরদাসপুর সীমান্ত থেকে পাকিস্তানের কারতারপুরের দূরত্ব মাত্র ৪ কিলোমিটার। ভিসা ছাড়াই পুণ্যার্থীরা কারতারপুর করিডর ব্যবহার করে গুরুদ্বারে যাতায়াত করতে পারেন, যা দুই দেশের সম্পর্কের এক অনন্য দিক বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর স্মৃতিতে তৈরি হয় দরবার সাহেব গুরুদ্বার। দেশভাগের পর কারতারপুর পাকিস্তানের পাঞ্জাবে পড়ে।















