সিনেমা বা সিরিজের পর্দায় অন্তরঙ্গ দৃশ্য অভিনয় করা অনেক সময় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যখন চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে দৃশ্যগুলোর যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, শুটিংয়ের সময় ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সীমা লঙ্ঘন করা হয় কিংবা চিত্রনাট্যের বাইরে কোনো দৃশ্য করতে চাপ দেওয়া হয়, তখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে অনেকে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন কিংবা ক্যারিয়ারের পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট ধরনের দৃশ্যে অভিনয় না করার কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই তালিকায় থাকা সাতজন তারকার অভিজ্ঞতা চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় বেশ আলোচিত।
মারিয়া স্নাইডারের ঘটনাটি চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত উদাহরণগুলোর একটি। বার্নার্দো বের্তোলুচ্চির ‘লাস্ট ট্যাঙ্গে ইন প্যারিস’ সিনেমায় অভিনয়ের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। ছবিটিতে মার্লন ব্র্যান্ডোর সঙ্গে তাঁর একটি অন্তরঙ্গ দৃশ্য নিয়ে পরে তীব্র সমালোচনা হয়। স্নাইডার বহু বছর পর জানিয়েছিলেন, ওই দৃশ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্পর্কে তাঁকে আগে জানানো হয়নি। এমনকি বের্তোলুচ্চি পরে স্বীকার করেন যে, অভিনেত্রীর কাছ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ার আশায় তিনি বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন। স্নাইডার ওই ঘটনাকে অপমানজনক বলে অভিহিত করেছিলেন। ১৯৯৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, এই সিনেমার অন্তরঙ্গ দৃশ্যটি তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এছাড়া ওই ছবির পর তিনি মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়াই করেছেন, যা তাঁর জীবনকে বিপর্যস্ত করেছিল। সিরিজটির জন্য তিনি গোল্ডেন গ্লোবও জিতেছিলেন। শোরনার ফ্র্যাঙ্কি শ বিষয়টি নিয়ে নিজের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন এবং সেটে বিষয়টি আরও ভালোভাবে সামলানো যেত বলেও স্বীকার করেছিলেন।
জনপ্রিয় সিরিজ ‘দ্য অ্যাফেয়ার’ থেকে রুথ উইলসনের বিদায়ও ছিল রহস্যঘেরা। চতুর্থ মৌসুমের পর হঠাৎ তাঁর সরে যাওয়ার পেছনে সিরিজের নগ্ন ও যৌনদৃশ্যের ধরন নিয়ে নির্মাতাদের সঙ্গে বিরোধ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। দ্য হলিউড রিপোর্টারের তথ্য অনুযায়ী, দর্শক টানার উদ্দেশ্যে অভিনেত্রীকে অতিরিক্ত ‘গ্রাফিক’ বা আপত্তিকর দৃশ্য করার চাপ দেওয়া হতো। উইলসন সেটে নিজেকে অনিরাপদ বোধ করতেন বলে জানিয়েছিলেন, যদিও চুক্তির গোপনীয়তা শর্তের কারণে তিনি বিস্তারিত বলতে পারেননি। উইলসন নিজে পরে বলেন, সেটে কিছু পরিস্থিতি তাঁর কাছে ঠিক মনে হয়নি এবং তিনি নিজেকে নিরাপদ মনে করেননি।
সামারা উইভিংয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠোর ছিল। ‘এসএমআইএলএফ’ সিরিজে অভিনয়ের সময় তাঁর চুক্তিতে নগ্নতার ব্যাপারে সীমাবদ্ধতা থাকার কথা থাকলেও, একটি দৃশ্যের জন্য তাঁকে মাত্র ৪০ মিনিটের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ‘ক্লোজড সেট’ থাকার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও মনিটর চালু রাখার অভিযোগ তোলেন তিনি। ওই পরিস্থিতির প্রতিবাদে তিনি সিরিজ ছেড়ে দেন। পরবর্তী সময়ে এই ঘটনার সূত্র ধরে হলিউডে ‘ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর’ বা ঘনিষ্ঠ দৃশ্য তদারককারীর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
অ্যান হ্যাথাওয়ে ‘নকড আপ’ ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, কিন্তু একটি বিশেষ দৃশ্য নিয়ে আপত্তির কারণে তিনি প্রকল্পটি থেকে সরে যান। সেথ রোগান জানিয়েছিলেন, সন্তানের জন্মদানের দৃশ্যটি কতটা বাস্তবধর্মী হবে তা নিয়ে হ্যাথাওয়ের অস্বস্তি ছিল, যার ফলে শেষ পর্যন্ত ওই চরিত্রে ক্যাথরিন হেইগল অভিনয় করেন। একই রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ইভা গ্রিন। ‘দ্য ড্রিমারস’-এর পর তিনি অনুভব করেছিলেন যে, দর্শক ও গণমাধ্যম তাঁর অভিনয়ের পরিবর্তে কেবল যৌনদৃশ্য নিয়েই বেশি আগ্রহী। তাই লার্স ফন ট্রিয়েরের ‘অ্যান্টিক্রাইস্ট’-এর বিতর্কিত প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দেন। একটি চরিত্র তাঁকে খ্যাতি দিয়েছিল, কিন্তু সেই চরিত্রের অন্তরঙ্গ দৃশ্যই শেষ পর্যন্ত তাঁর ক্যারিয়ারের ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলেছিল। কিন্তু শুটিং শুরুর আগে একটি দৃশ্য নিয়ে তাঁর আপত্তি তৈরি হয়। দৃশ্যটি কতটা বাস্তবধর্মীভাবে দেখানো হবে, তা নিয়ে অভিনেত্রী অস্বস্তিতে ছিলেন। ইভা গ্রিনের সামনে এসেছিল লার্স ফন ট্রিয়ের ‘অ্যান্টিক্রাইস্ট’–এ অভিনয়ের সুযোগ।
কিরা নাইটলি ২০২১ সালে স্পষ্ট করে দেন যে, পুরুষ নির্মাতার পরিচালনায় অন্তরঙ্গ দৃশ্যে তিনি আর কাজ করবেন না। তাঁর মতে, নারীর শরীর ও যৌনতাকে ঘিরে দৃশ্য করতে হলে নারী নির্মাতার সঙ্গে কাজ করাই স্বাচ্ছন্দ্যের। এ ছাড়া ইন্টারনেটে নগ্ন দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তাঁকে চিন্তিত করে। অন্যদিকে, ‘গেম অব থ্রোন্স’ সিরিজে এমিলিয়া ক্লার্কের অভিজ্ঞতা ছিল বেশ যন্ত্রণাদায়ক। ২৩ বছর বয়সে ক্যারিয়ারের শুরুতে সিরিজের নগ্নতা ও অন্তরঙ্গ দৃশ্য নিয়ে তিনি বিভ্রান্তিতে ভুগতেন। এমন অনেক দৃশ্য ছিল যার আগে তিনি ভয়ে কেঁদেছেন। তিনি দাবি করেন, সিরিজটি শেষ হওয়ার পরও তাঁকে নগ্ন দৃশ্য করতে চাপ দেওয়া হয়েছিল, যা তাঁর মানসিক চাপের কারণ ছিল।

















