একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে ভাষা শিক্ষার উপকরণ এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। দুই-তিন দশক আগেও একটি শব্দের সঠিক উচ্চারণ কিংবা অর্থ জানতে যেখানে বিশাল অভিধানের পাতা উল্টাতে হতো, এখন সেখানে স্মার্টফোনেই মিলছে বিশ্বমানের ডিকশনারি, গ্রামার সফটওয়্যার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ভাষা শেখার হাজারো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। প্রযুক্তির এমন সহজলভ্যতা সত্ত্বেও অদ্ভুত এক বাস্তবতার মুখোমুখি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা; শিক্ষার্থীরা আগের চেয়ে ইংরেজি বলা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পিছিয়ে পড়ছে।
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ইংরেজিকে কেবল পাঠ্যবইনির্ভর না রেখে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে দেশে ‘কমিউনিকেটিভ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচিং’ (সিএলটি) পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও এই পদ্ধতির কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি। বছরের পর বছর ইংরেজি পড়েও অধিকাংশ শিক্ষার্থী স্বাচ্ছন্দ্যে দুই বাক্য বলতে পারে না, এমনকি নির্ভুলভাবে লিখতে গিয়েও হিমশিম খায়। এই ব্যর্থতার মূলে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি।
আমাদের মূল্যায়নের পুরো পদ্ধতি কেবল পড়া ও লেখার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এমনকি পাবলিক পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের চূড়ান্ত পরীক্ষায় লিসনিং বা স্পিকিংয়ের জন্য কোনো নম্বর বরাদ্দ নেই। জিপিএ ও মার্কস-নির্ভর এই শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষায় নম্বর না থাকায় শিক্ষক বা শিক্ষার্থী কেউ-ই ভাষাটি শোনার বা বলার চর্চায় আগ্রহী হন না। লিসনিং ও স্পিকিংকে পরীক্ষার মূল্যায়নের বাইরে রাখায় ইংরেজি শিখানোর উদ্যোগ শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে।
কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ। বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্সল এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে একটি ছোট কক্ষে ৬০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস নেওয়া হয়। এত শিক্ষার্থীর ভিড়ে কথা বলার চর্চা বা গ্রুপ অ্যাকটিভিটি করানো একজন শিক্ষকের জন্য কার্যত অসম্ভব। এছাড়া অনেক শিক্ষকের নিজস্ব ইংরেজি বলা ও শোনার দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। যথাযথ অডিও-ভিজ্যুয়াল সরঞ্জাম ও পরিবেশ নিশ্চিত না করে কেবল তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে পদ্ধতি চালু করায় পূর্বের ব্যাকরণ ও অনুবাদের মাধ্যমে যেটুকু লেখার দক্ষতা অর্জিত হতো, সেটিও এখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার ‘টপ-ডাউন’ বা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া পদ্ধতিও সমস্যার অন্যতম কারণ। বড় বড় শিক্ষানীতি প্রণয়নে প্রায়শই উচ্চপর্যায়ের আমলা, বিদেশি পরামর্শক বা শিক্ষাবিদরা যুক্ত থাকেন, যাদের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ কম। অথচ যিনি প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থীকে সরাসরি পড়ান, সেই প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্তরের ইংরেজি শিক্ষকের অভিজ্ঞতা ও মতামত নীতিনির্ধারণী টেবিলে খুব কমই গুরুত্ব পায়। মাঠপর্যায়ের বাস্তবিক ফিডব্যাক ছাড়া পলিসি বাস্তবায়নের কারণেই বছরের পর বছর একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
শিক্ষার্থীদের ইংরেজিভীতি দূর করতে ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে এখন জরুরি ভিত্তিতে কিছু সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমত, বোর্ড পরীক্ষা ও অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে অবিলম্বে লিসনিং ও স্পিকিং টেস্ট অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অন্তত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ নম্বর যদি মৌখিক পরীক্ষা ও শুনে বোঝার দক্ষতার ওপর বরাদ্দ থাকে, তবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তা চর্চায় উদ্বুদ্ধ হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত আধুনিক ও কার্যকর ভাষা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রতিটি স্কুলে মাল্টিমিডিয়া রুম ও ভাষাচর্চার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষানীতি তৈরিতে কেবল তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর না করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অভিজ্ঞ ইংরেজি শিক্ষকদের সরাসরি মতামত গ্রহণ করতে হবে। প্রযুক্তির অসীম সুবিধা তখনই কার্যকর হবে, যখন পরীক্ষার ভুল কাঠামো শুধরে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করা সম্ভব হবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, এই পরিবর্তনগুলোই তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় দক্ষ করে তুলতে পারে।















