Sunday , 11 October 2026 | [bangla_date]
  1. অন্যান্য
  2. আন্তর্জাতিক
  3. ই-পেপার
  4. খেলা
  5. জনপ্রিয়
  6. জাতীয়
  7. দুর্যোগ
  8. দেশের খবর
  9. বাণিজ্য
  10. বিনোদন
  11. রাজনীতি

ভাইতন্ত্রে জিম্মি জনজীবন: চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের নেপথ্যে কারা

প্রতিবেদক

October 11, 2026 4:36 am

দেশের অলিগলিতে এখন এক অদ্ভুত ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কারো পেশা বা জীবনযাত্রা নিয়ে প্রশ্ন করলেই উত্তর আসে, অমুক ভাইয়ের সঙ্গে আছি। এই ‘ভাই’ পরিচিতি কেবল একটি পরিচয় নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী চাঁদাবাজ নেটওয়ার্কের নাম। স্থানীয় মাস্তান থেকে শুরু করে প্রভাবশালী নেতা—সবার বিচরণ এই বলয়ে। এরা ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ে ওস্তাদ। পুলিশও অনেক ক্ষেত্রে তাদের ধরতে অনাগ্রহ দেখায়, উল্টো উপরমহলে প্রতিবেদন পাঠায় যে অভিযুক্তকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শিল্পপতি থেকে শুরু করে সাধারণ ব্যবসায়ী—সবাই এই ‘ভাই’দের মাসিক চাঁদা দিতে বাধ্য হন। এই আতঙ্কে অনেকে এলাকা ছাড়া কিংবা নতুন ব্যবসা স্থাপনে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এমনকি ব্যাংক ঋণের প্রক্রিয়াও এখন তাদের হাতের মুঠোয়। ম্যানেজারদের শাসিয়ে রাখা হয় যেন লোন পাস হওয়ার আগাম খবর তাদের দেয়া হয়। আসলে ‘ভাই’ কী করেন এলাকার সবাই জানেন। উপরের তলায় খবর পাঠায়-স্যার, তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। শিল্পপতিরা মাস শেষে তাকে সম্মানী পাঠান। চাঁদাবাজের ভয়ে অনেক ব্যবসায়ী পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

চাঁদাবাজির এই নেটওয়ার্ক শহর থেকে গ্রাম, সর্বত্রই সমান সক্রিয়। ফুটপাতের ছোট দোকান থেকে বড় শিল্পাঞ্চল—কোথাও নিস্তার নেই। দিনের পর দিন তিনটি ভিন্ন গ্রুপকে চাঁদা দিতে গিয়ে দিশাহারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। স্কুল-কলেজ অঙ্গনেও এই দৌরাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাসকদলের সমর্থন ও প্রশাসনের পরোক্ষ মদত ছাড়া এই অপরাধ কর্মকাণ্ড চালানো সম্ভব হয় না। এমনকি ফুটপাতের যান চলাচলের নিয়ন্ত্রণও এই ‘ভাই’দের দখলে। মাদক ও অস্ত্রের ব্যবহার এবং কিশোর গ্যাং লালন-পালনের মাধ্যমে পুরো এলাকা জিম্মি করে রাখা হয়। সম্প্রতি রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা ও বিভিন্ন আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে দখলবাজির অভিযোগ জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এই মাসোহারা সংস্কৃতি ও নিম্নমানের মালামাল সরবরাহের চাপে অতিষ্ঠ। হালে আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধেও দখলবাজির নানা অভিযোগ। শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে সব জায়গাতে একই চিত্র।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক দুর্বলতাই চাঁদাবাজির এই ভয়াবহ প্রসারের প্রধান কারণ। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন সরাসরি এই নেটওয়ার্কের সহযোগী হিসেবে কাজ করে। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বদলি বা পদোন্নতির ক্ষেত্রেও অনেক সময় লেনদেন বা ‘ভাই’দের ইশারা কাজ করে। পুলিশের একজন কর্মকর্তা আক্ষেপ করে জানান, পুলিশকে দোষারোপ করা হলেও, প্রমোশন ও পোস্টিং কেনাবেচার মতো সংকটের কারণে অনেক সময় কর্মকর্তাদের আপস করতে হয়। নিজের বিনিয়োগ করা পুঁজি ওঠাতে অনেক অফিসার চাঁদাবাজদের সঙ্গে মিলে কাজ করতে বাধ্য হন। ফলে সরকারি ও স্থানীয় নিয়োগ বা ঠিকাদারি থেকে শুরু করে সব জায়গায় ‘ভাই’দের ছড়ি ঘোরানোর দাপট বজায় থাকে। কথায় কথায় একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলছিলেন, ‘আপনারা সবসময়ই আমাদের দোষারোপ করেন।

টেন্ডার বাণিজ্য এখন চাঁদাবাজদের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন আসার পরপরই বিভিন্ন গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। কাজের বরাদ্দের আগেই সমঝোতা করতে হয় ‘ভাই’য়ের সাথে। হাট-বাজার, বালুমহাল ইজারা কিংবা কবরের মাটি কেনা—সবখানেই এই নেটওয়ার্কের আধিপত্য। শাসকদলের অনেক নেতার নাম জড়িয়ে পড়ে এই চাঁদাবাজির ভাগ নিয়ে। অপরাধের এই ধরন পাল্টেছে সময়ের সাথে। আগে বিদেশে অর্থ পাচার করা হতো, এখন ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনীয়তায় লেনদেন করা হচ্ছে, যা শনাক্ত করা কঠিন। বলেন, আমরা দেখেও নাকি দেখি না।

সরকার পরিবর্তন হলেও এই চাঁদাবাজদের ফরম্যাট বা নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বদলায় না, বরং তারা নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। সাধারণ মানুষ কেবল জিম্মি হিসেবেই রয়ে যায়। বিদেশগামী কর্মীদের কাছ থেকে ছাড়পত্রের নামে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় বা ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা দিন দিন বাড়ছে। এই পুরো চক্রটি ভাঙতে না পারলে জনজীবন নিরাপদ হওয়া কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ - আন্তর্জাতিক