মুঘল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে ১৬৫৬ সালে এক বিনীত আবেদনের প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় তাদের প্রথম বাণিজ্যিক কারখানা স্থাপনের অনুমতি পায়। এই রাজকীয় অনুমোদনের সুবাদে কোম্পানি খুব দ্রুত বালাসোর, কাশিমবাজার ও পাটনায় তাদের ব্যবসার পরিধি বিস্তার করে। ব্যবসার এই প্রাথমিক ধাপের তিন বছর পর ১৬৯০ সালে জোব চার্নক কোম্পানির জন্য ১৩০০ রুপির বিনিময়ে সুতানটি, গোবিন্দপুর ও দিহি-কালকুট্টা নামক তিনটি গ্রাম নিয়ে প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ বসতি স্থাপন করেন।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতার সুযোগে বাংলার প্রশাসনিক কাঠামোতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুর্শিদ কুলি খানের হাত ধরে বাংলা কার্যত একটি স্বাধীন প্রদেশে পরিণত হয়, যা নবাব আলিবর্দী খানের শাসনামল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। কিন্তু ১৭৫৬ সালে আলিবর্দীর মৃত্যুর পর তার দৌহিত্র সিরাজ-উদ-দৌলার অভিষেককে কেন্দ্র করে মুর্শিদাবাদের দরবারে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র দানা বাঁধে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে কোম্পানি ব্রিটিশ স্বার্থ হাসিলের জন্য সিরাজের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খানের সাথে গোপন আঁতাত গড়ে তোলে। এরই পরিণতিতে ১৭৫৭ সালের জুন মাসে পলাশীর প্রান্তরে প্রতারণামূলক যুদ্ধে সিরাজ-উদ-দৌলা পরাজিত ও নিহত হন, আর রবার্ট ক্লাইভ মীর জাফরকে নতুন নবাব হিসেবে ক্ষমতায় বসান।
কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রমের আড়ালে বিনা শুল্কে অবৈধ ব্যক্তিগত ব্যবসা পরিচালনা ও নবাবের অনুমতি ছাড়া কলিকাতা দুর্গ সম্প্রসারণকে ঘিরে সিরাজ-উদ-দৌলার সাথে কোম্পানির বিরোধ তীব্র হয়। পরবর্তীকালে মীর জাফরের ওপর কোম্পানির ক্রমবর্ধমান অন্যায় চাপের মুখে তিনি ডাচ্ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে আঁতাত করলে নতুন সংকট সৃষ্টি হয়। মীর কাশিম নবাব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিনা শুল্কে ব্রিটিশ বাণিজ্যের দাবির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানির ওপর থেকেও বাণিজ্য শুল্ক তুলে নেন, যা ব্রিটিশদের স্বার্থে আঘাত হানে।
ইতিহাসবিদ বিপান চন্দ্রের মতে, ১৭৬০ সালে ব্রিটিশ শিল্প বিপ্লবের সময়কালে ব্রিটেন একটি উন্নত পুঁজিতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বিকশিত হচ্ছিল, যেখানে ভারতবর্ষ অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতার দিকে ধাবিত হচ্ছিল। এই পুরো সময়কালটি ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের রাজদণ্ড প্রতিষ্ঠার এক জটিল ইতিহাস, যা বাংলার সমাজ ও রাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৭। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইংরেজ বণিকরা যখন সম্রাট শাহজাহানের দরবারে ভারতে ‘কারখানা’ স্থাপনের অনুমতি প্রার্থনা করে, তখন ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর বিদ্রোহের ফলে মুঘল সাম্রাজ্য ভেতরের দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তথাপি, ব্রিটিশ বণিকরা দিল্লির সম্রাটের দরবারে অত্যন্ত বিনয়ী আচরণ প্রদর্শন করেছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ সময়কালে ভারতবর্ষের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও তার প্রেক্ষিতে ইংরেজ বণিকদের আচরণ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর্যবেক্ষণ রীতিমতো প্রণিধানযোগ্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঠাকুর লিখেছেন, “[তখন] মোগল-সাম্রাজ্যের পতনোন্মুখ প্রবেশদ্বারে ইংরাজ বণিক সম্প্রদায় অত্যন্ত দীনভাবে দণ্ডায়মান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তখন ভারতক্ষেত্রে সংহারশক্তি যতপ্রকার বিচিত্র বেশে সঞ্চরণ করিয়া ফিরিতেছিল, তন্মধ্যে সর্বাপেক্ষা সাধু শান্ত ও দরিদ্র বেশ ছিল ইংরাজের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মারাঠি অশ্বপৃষ্ঠে দিগ-দিগন্তরে কালানল জ্বালাইয়া ফিরিতেছিল, শিখ ভারতের পশ্চিম প্রান্তে আপন দুর্জয় শক্তিকে পুঞ্জীভূত করিয়া তুলিতেছিল, মোগল-সম্রাটের রাজপ্রতিনিধিগণ সেই যুগান্তরের সন্ধ্যাকালে ক্ষণে ক্ষণে বিদ্রোহের রক্তধ্বজা আন্দোলন করিতেছিল, কেবল কয়েকজন ইংরাজ। 29.
তথ্যসূত্র ও প্রাসঙ্গিক গবেষণাপত্র
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “সিরাজদ্দৌলা”, প্রবন্ধ সমগ্র, পৃষ্ঠা: ৫৭৯
- Tirthankar Roy, The East India Company, পৃষ্ঠা: ৮৯
- Bipan Chandra, ‘The Impact of British Rule’, Freedom Struggle, পৃষ্ঠা: ১৬-১৭
















