ভালো চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে অন্তত দুজন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের একজন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার মো. আলী হাসান সোহেল এবং অন্যজন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মো. পলাশ শেখ। বর্তমানে মস্কো থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরবর্তী পেনজা শহরের একটি হাসপাতালে ১ মাস ১০ দিন ধরে ভর্তি আছেন আলী হাসান। অন্য হাসপাতালে ২৪ দিন ধরে চিকিৎসাধীন আছেন পলাশ শেখ, যিনি ড্রোন হামলায় এক হাত হারিয়েছেন। হাসপাতালটি রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে। কাঁদতে কাঁদতে আলী হাসান বলেন, ‘এ জীবন কেউ চায় না। মারাও যাচ্ছেন কেউ কেউ, যার সঠিক সংখ্যা জানা যায় না।
আলী হাসান জানান, গত ৭ মে তাঁদের ৩০ জনের একটি দল নির্মাণশ্রমিক হিসেবে রাশিয়ায় যায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত কাজ না দিয়ে চতুরতার সঙ্গে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। মাত্র পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হয়। সেখানে মাইলের পর মাইল হেঁটে এবং শুকনো খাবার খেয়ে মাটির নিচের সুড়ঙ্গ ক্যাম্পে অবস্থান করতে হয়েছে। একপর্যায়ে হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে তাঁদের সামনের দিকে পাঠানো হতো। নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিরা বলছেন, ওই ৩০ জনকে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ১৬ জনের দলে ছিলেন আলী হাসান। একপর্যায়ে তাঁদের দলের বাকি ১১ জনও যোগ দেন। ১৬ জনের দল থেকে ১৪ জন নিখোঁজ এখন, আর বাকি ২ জন হাসপাতালে ভর্তি।
যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আলী হাসান বলেন, ‘যুদ্ধে যেতে না চাইলে বন্দী রেখে মারধর ও শাস্তি দেওয়া হয়। পরে বাধ্য হয়ে যেতে হয়। অস্ত্র হাতে দিয়ে বলা হয় সামনে-পিছে বা ডানে-বাঁয়ে যেতে। এটি মূলত ইউক্রেনীয় ড্রোনের হামলার মুখোমুখি করার এক ধরনের মরণফাঁদ। আমার এক বছরে পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নেই। সুস্থ হলে আবারও যুদ্ধে পাঠানোর ভয় রয়েছে, তাই যেকোনোভাবে দেশে ফিরতে চাই।’ আলী হাসান আরও বলেন, ‘এক বছরে পায়ের ওপর দাঁড়াতে পারব কি না জানি না। গতকাল বুধবার তাঁর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়। কবে দেশে ফিরতে পারব, এই প্রার্থনা করি সারাক্ষণ। ‘আমাদের যুদ্ধে পাঠায় দিচ্ছে, আমার মাকে দেখে রাখিস’।
অন্যদিকে একই দলে রাশিয়ায় যাওয়া পলাশ শেখের ফুফাতো ভাই আবু সালেহ ইসলাম জানান, ড্রোন হামলায় পলাশের এক হাত উড়ে গেছে। এক হাত না থাকায় হয়তো তাঁকে আর যুদ্ধে পাঠানো হবে না। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হলে দেশে ফেরার আশা করছেন তিনি। দুই আহত সদস্যের পরিবারই পাওনাদারদের চাপে রয়েছে এবং ঋণের বোঝা বহন করছে। পরিবারটির শেষ আশা, পবিত্র বেঁচেও থাকতে পারেন। ‘দুনিয়ায় দেখা না হলে দেখা হবে হাশরের মাঠে’, রাশিয়ায় নিহত বাংলাদেশিদের লাশও দেশে আসে না।
আহত এই কর্মীদের উদ্ধার ও দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক সাহায্যের আবেদন জানিয়ে গত ২৬ জুলাই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পৃথক আবেদন করেছেন আলী হাসানের স্ত্রী আকলিমা খাতুন এবং পলাশ শেখের বোন চুমকি খানম। আবেদনে বলা হয়, চড়া সুদে ঋণ ও ধারদেনা করে রাশিয়ায় গিয়ে তাঁরা প্রতারিত হয়েছেন। তাই তাঁদের উদ্ধারে কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। যেমনে পারেন, আমারে উদ্ধার করেন; পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেন।’।
রাশিয়ায় যাওয়া ওই ৩০ জনের মধ্যে অন্তত ১৫ জনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, সেখানে গিয়ে কেউই নির্ধারিত চাকরি পাননি। প্রতারণার মাধ্যমে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এই দলের অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে, ৬ জন এখনো যুদ্ধে আছেন এবং দুজন হাসপাতাল থেকে পালিয়ে দেশে ফিরেছেন। বাকী দুজন হাসপাতালে ভর্তি থেকে উদ্ধারের আকুতি জানাচ্ছেন। তিনিসহ ৩০ জনের ১৫ জনের সঙ্গে কথা বলেছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় কর্মী যাওয়ার হার বহুগুণ বাড়ে। কিন্তু সেখানে গিয়ে অনেক কর্মীই মূলত টোপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে যুদ্ধে প্রাণ হারাচ্ছেন। এ পর্যন্ত অন্তত ৫৪ জন বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। নিহতদের মরদেহ দেশে পাঠানো হয় না এবং তাঁদের পরিবারগুলো কোনো ক্ষতিপূরণ পায় না।
এদিকে আহত দুই বাংলাদেশির বিষয়ে মস্কোর বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা কোনো ব্যক্তি দেশে ফেরার বিষয়ে এখনো সরাসরি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। অন্যদিকে ঢাকায় অবস্থিত রাশিয়া দূতাবাসের কাছেও ই-মেইলের মাধ্যমে এ বিষয়ে বক্তব্য চাওয়া হয়েছে, যা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে। বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করেছি, সুস্থ হলে [দেশে ফেরানোর] চেষ্টা করবে বলে জানিয়েছে।
সমস্যার সমাধানে অভিবাসন খাতের গবেষণা সংস্থা রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী জানান, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিদের দায়িত্ব অবিলম্বে মস্কোর বাংলাদেশ দূতাবাসকে নিতে হবে। রাশিয়ার সরকারের কাছ থেকে তাদের চিকিৎসা খরচ, বকেয়া পাওনা ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায়ের পাশাপাশি সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা জরুরি।














