স্মার্টফোন কেনা মানেই একসময় বাক্সের ভেতরে চার্জার, কেব্ল, ইয়ারফোন এমনকি সুরক্ষার জন্য ব্যাক কভারও পাওয়া যেত। তবে সময়ের সাথে এই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে। শুরুতে ইয়ারফোন এবং পরবর্তীতে চার্জার সরিয়ে নেওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে। পরিবেশ সুরক্ষার দোহাই দিয়ে অনেক নামি প্রতিষ্ঠান এখন নতুন ফোনের সাথে চার্জার দিচ্ছে না। যদিও এই সিদ্ধান্তের পেছনে উৎপাদন ব্যয় কমানোর ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে ক্রেতাদের মনে বিস্তর প্রশ্ন রয়ে গেছে।
স্মার্টফোন দুনিয়ায় এই ধারার সূচনা করে অ্যাপল। ২০২০ সালে আইফোন ১২ সিরিজের সাথে কোম্পানিটি প্রথম বক্সে চার্জিং অ্যাডাপ্টার দেওয়া বন্ধ করে। পরের বছর স্যামসাং তাদের গ্যালাক্সি এস–২১ সিরিজের ক্ষেত্রে একই পথ অনুসরণ করে। ধীরে ধীরে অন্যান্য অনেক নির্মাতাও এই তালিকায় যোগ দিয়েছে। তবে সব অ্যান্ড্রয়েড নির্মাতা এখনো চার্জার বাদ দেয়নি। নির্মাতাদের পক্ষ থেকে বারবার পরিবেশ সুরক্ষার যুক্তি দেওয়া হয়। তাদের দাবি, অধিকাংশ ব্যবহারকারীর বাড়িতে একাধিক চার্জার আগে থেকেই থাকে। প্রতিটি নতুন ফোনের সাথে বাড়তি চার্জার দিলে এমন অনেক ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদিত হয়, যার কোনো প্রয়োজন নেই। এছাড়া বাক্সের আয়তন ছোট হলে পরিবহন খরচ কমে এবং প্যাকেজিংয়ে কম উপকরণ লাগে, যা পরিবেশের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দাবি করা হয়।
তবে পরিবেশ সুরক্ষার চেয়ে আর্থিক সাশ্রয় এখানে বড় ভূমিকা রাখছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। একটি চার্জার কম উৎপাদন মানেই কোম্পানিগুলোর প্যাকেজিং ও লজিস্টিকস খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। কোটি কোটি ফোন বিক্রির ক্ষেত্রে এই সামান্য সাশ্রয় মোট মুনাফাতে বড় প্রভাব ফেলে। বিষয়টি এমন যে, নির্মাতারা বক্সে চার্জার দিচ্ছে না, আবার ক্রেতার প্রয়োজন হলে সেই প্রতিষ্ঠান থেকেই চড়া দামে চার্জার কিনতে হচ্ছে। এই ব্যবসায়িক মডেলটি ক্রেতাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। ফোনের দাম নির্ধারণে যন্ত্রাংশ ও গবেষণার মতো চার্জার বাদ দেওয়ার কারণেও কি ফোনের দাম নির্দিষ্ট পরিমাণ কমানো উচিত ছিল না? এমন প্রশ্ন এখন সাধারণ ব্যবহারকারীদের মুখে মুখে।
দ্রুত চার্জিং প্রযুক্তি চার্জার নির্বাচনকে জটিল করে তুলেছে। বর্তমানের অনেক স্মার্টফোন মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চার্জ নিতে পারে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দ্রুত চার্জিং প্রযুক্তি থাকে, যা সব চার্জারে কাজ করে না। বাড়িতে থাকা পুরোনো চার্জারটি দিয়ে নতুন ফোন চার্জ করা সম্ভব হলেও, দ্রুত চার্জিংয়ের পূর্ণ সুবিধা পাওয়ার জন্য নতুন ও নির্দিষ্ট প্রযুক্তির চার্জার প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নতুন ফোন কেনার পর ব্যবহারকারীকে আবার নতুন চার্জার কিনতে হচ্ছে। ফলে চার্জার বাদ দেওয়ার পরিবেশগত যুক্তিও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, কারণ আলাদাভাবে চার্জার কিনলে সেটির প্যাকেজিং ও পরিবহনের জন্য আবার কার্বন নিঃসরণ ঘটে। তবে যারা পুরোনো চার্জার দিয়েই নতুন ফোন চালিয়ে নিচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে ই-বর্জ্য কমার বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখা যেতে পারে।
চার্জিংয়ের ক্ষেত্রে ইউএসবি-সি প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার অনেকটা স্বস্তি এনেছে। আগে প্রতিটি ব্র্যান্ডের আলাদা চার্জিং পোর্ট ছিল, এখন একটি মানসম্মত ইউএসবি-সি চার্জার দিয়েই ফোন, ট্যাবলেট ও ল্যাপটপের মতো নানা ডিভাইস চার্জ করা যাচ্ছে। এটি ইলেকট্রনিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে প্রযুক্তি যতই সুবিধাজনক হোক না কেন, ক্রেতাদের পছন্দের সুযোগ রাখা উচিত ছিল। যাদের চার্জার প্রয়োজন নেই, তারা চার্জার ছাড়া কম দামে ফোন কিনতে পারেন, আর যাদের প্রয়োজন তারা যেন চার্জারসহ প্যাকেজ বেছে নেওয়ার সুবিধা পান। এভাবে ভারসাম্য রক্ষা করলে একদিকে যেমন ই-বর্জ্য কমবে, অন্যদিকে ক্রেতাদের ওপর বাড়তি খরচের চাপও কমবে। পরিবেশ সুরক্ষা ও ব্যবসায়িক মুনাফার এই দ্বন্দ্বে কোন কারণটি কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবই এখনো মূল সমস্যা হয়ে রয়ে গেছে।















