২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) পাঠ্যবইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে মানুষের মস্তিষ্কের পরিবর্তে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহারের বিষয়টি ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দাঁড়িপাল্লা একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রতীক হওয়ায় বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সমালোচনা শুরু হলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জরুরি ভিত্তিতে তা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে।
বইয়ের ‘উপাত্ত ও তথ্য’ অধ্যায়ে জ্ঞানের পিরামিড ধারণাটি তুলে ধরা হয়েছে। এই পিরামিডে চারটি স্তরের জন্য আলাদা প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে উপাত্তের স্তরে বৃত্তাকার প্রতীক, তথ্যের স্তরে নেটওয়ার্ক সদৃশ চিত্র এবং জ্ঞানের স্তরে মানুষের মস্তিষ্কের ছবি রয়েছে। তবে পিরামিডের সর্বোচ্চ স্তর বা প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করায় প্রশ্ন উঠেছে। পিরামিডটিতে নিচ থেকে ওপরের দিকে চারটি স্তর রয়েছে—উপাত্ত, তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা।
এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক মো. রিয়াজুল ইসলাম জানিয়েছেন, বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কোনো ভুল তথ্য দেওয়া হবে না, তা নিশ্চিত করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এরই অংশ হিসেবে আপাতত বইয়ের ছাপার কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা বইগুলো সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট প্রতীক পরিমার্জন সাপেক্ষে আবার শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হবে। ফলে মাঠপর্যায়ে চলে যাওয়া বই সংগ্রহ করে সংশোধন করতে হলে বাড়তি খরচ ও সময়ের প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা বই সংগ্রহ করে পরিমার্জন শেষে আবার শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।
যদিও বইয়ের মুদ্রণমালিকরা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে বই ছাপানো, বাঁধাই ও সরবরাহের বড় একটি অংশ সম্পন্ন হয়েছে। মুদ্রণকারীদের মতে, মাঠ থেকে বই ফিরিয়ে এনে সংশোধন করা বেশ সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। এনসিটিবির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের প্রায় ৩৮ লাখ কপি ছাপানো হচ্ছে এবং সব মিলিয়ে প্রায় ৩১ কোটি বইয়ের মুদ্রণ কাজ চলমান রয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ে বই বিতরণে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। তবে মুদ্রণমালিকেরা জানিয়েছেন, বইটির ছাপা, বাঁধাই ও সরবরাহের কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এনসিটিবির বই ছাপানোর হিসাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাধ্যমিকের বিভিন্ন শ্রেণির বই ছাপানোর কাজে ধীরগতি রয়েছে। এতে নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীদের কাছে বই পৌঁছানো ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এর বেশির ভাগই ইতোমধ্যে ছাপা হয়ে গেছে।
উল্লেখ্য যে, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির পরিমার্জিত আইসিটি বইয়েও প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লা ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন এনে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফেরার পর সেই বইয়ে দাঁড়িপাল্লার প্রতীকটি যুক্ত করা হয়েছিল। অথচ চলতি শিক্ষাবর্ষের বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে মস্তিষ্কের ছবি ব্যবহৃত হয়েছিল। ২০২৭ সালের বইয়ে পুনরায় দাঁড়িপাল্লা ফিরে আসায় এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দাঁড়িপাল্লা একটি রাজনৈতিক দলের প্রতীক হওয়ায় পাঠ্যবইয়ে এর ব্যবহার বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তবে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে ভবিষ্যতে কী ছবি রাখা হবে বা কীভাবে পুরো বিষয়টি সংশোধন করা হবে, সে বিষয়ে এনসিটিবি এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে প্যাঁচা বা বইয়ের মতো চিত্র ব্যবহারের নজির থাকলেও এ বিষয়ে সর্বজনস্বীকৃত কোনো একক উত্তর নেই বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষাবিদরা।















