জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিতে গিয়ে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি সতর্ক করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়গুলোর একটি অতিক্রম করছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে তিনি বলেন, গালফ অঞ্চলে যা ঘটছে তা হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে ভুল নীতি এবং সংকট ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার পুঞ্জীভূত ফল। তিনি স্পষ্টভাবে ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতির প্রতি ইঙ্গিত করেন, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আমিরের মতে, সংকটের মূলে রয়েছে আলোচনার অভাবে শক্তিশালী পক্ষগুলোর বেপরোয়া আচরণ। তিনি দাবি করেন, একটি রাষ্ট্র তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও যুদ্ধে টেনে নিতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ জ্বালানি যে জলপথ দিয়ে যাতায়াত করে, তাকে দর-কষাকষির হাতিয়ার বানানো হয়েছে। এর ফলে দূরবর্তী মহাদেশের সাধারণ মানুষের ওপরও খাদ্য ও ওষুধের দাম বৃদ্ধির মতো অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি একটি নতুন আঞ্চলিক ‘যৌথ নিরাপত্তা’ কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষ্যমতে, এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন যা সব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এই কাঠামোর অনুপস্থিতিতেই মূলত যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া সহজতর হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কাতার শুরু থেকেই সংঘাত নিরসনে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সংলাপের পথ সমর্থন করে আসছে।
গাজা ইস্যুকে আমিরের ভাষণে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি ফিলিস্তিনের বর্তমান অবস্থাকে মানবজাতির বিবেকের জন্য একটি কলঙ্ক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলি নেতারা যেভাবে জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ বা অভিবাসনের পরিকল্পনা করছেন, তা সরাসরি গণহত্যা। তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমালোচনা ও প্রতিবাদকে পাত্তা না দিয়ে উল্টো ইহুদি-বিদ্বেষের অভিযোগ তুলে কিংবা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সাজিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে।
শেখ তামিম ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, গাজায় অভিযান সম্পূর্ণ বন্ধ করা, সেনা প্রত্যাহার এবং কোনো শর্ত ছাড়াই মানবিক সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। তিনি সতর্ক করেন যে, যারা উচ্ছেদকেই সমাধান মনে করে, তারা কখনোই শান্তি স্থাপনে সহযোগিতা করবে না। ইসরায়েলের এই বেআইনি কর্মকাণ্ডের লাগাম টানাই এখন আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
তিনি পশ্চিম তীরে বর্ণবাদ ও বসতি-সন্ত্রাসের নিন্দা জানানোর পাশাপাশি আল-আকসা মসজিদের অবমাননা ও পূর্ব জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনিদের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখার বিষয়টিকে একটি ‘খোলা ক্ষত’ হিসেবে বর্ণনা করেন। একইসঙ্গে সিরিয়া, লেবানন ও গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও তিনি সরব হন। তিনি অভিযোগ করেন যে, ইসরায়েল লেবাননের ভূখণ্ড দখল বজায় রাখার চেষ্টা করছে এবং দক্ষিণ লেবাননের গ্রামগুলোকে ধ্বংস করছে, যা ফিলিস্তিনের ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাত নিয়েও আমির তাঁর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করার আহ্বান জানান। এছাড়া সিরিয়া ও লিবিয়ার জনগণের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় কাতারের সমর্থনের কথা জানান। সুদানে টেকসই শান্তি ফেরাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের প্রয়োজনীতার ওপর তিনি জোর দেন। সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন এবং ইয়েমেন সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়ে তিনি তাঁর ভাষণ শেষ করেন।
ভাষণের উপসংহারে শেখ তামিম বলেন, জাতীয় মর্যাদা ও নীতির সঙ্গে কোনো আপস করা যায় না। তাঁর ভাষায়, শান্তির জন্য কূটনৈতিক সুযোগ এখনো বিদ্যমান এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়ে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসাই এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে এই সুযোগ হাতছাড়া না করার অনুরোধ জানান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, গাল্ফ অঞ্চলের এই পরিস্থিতি ‘কারো কাছেই বিস্ময়ের হওয়া উচিত নয়’, বরং এর প্রভাব পুরো বিশ্বজুড়েই ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি মূলত ইরান যুদ্ধের কথাই ইঙ্গিত করেন, যার জেরে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোয় হামলা চালানো হয়েছে এবং বন্ধ হয়ে গেছে হরমুজ প্রণালি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি জানান, বিরোধ নিরসনের একমাত্র পথ হিসেবে কাতার বরাবরই সংলাপ ও আলোচনাকে সমর্থন করে এসেছে-আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ন্যায্য সমাধানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর ভাষায়, ‘সংকট-পরবর্তী সময়েও এই অবস্থানই আমাদের রয়ে গেছে।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর কথায়, ‘এমন ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতেই যুদ্ধ বেধে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি আরও বলেন, ‘একটি পক্ষের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠেছে তার প্রতিবেশীদের এমন এক যুদ্ধে টেনে নিয়ে যাওয়া, যা আদতে তাদের নিজেদের যুদ্ধই নয়-উত্তেজনা এড়াতে তাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সম্পদকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রাণরেখাগুলোকে চাপ ও দর-কষাকষির হাতিয়ারে পরিণত করাও সম্ভব হয়েছে, যার মাশুল দিচ্ছে প্রতিটি মহাদেশের মানুষ-যদিও এই সংঘাতের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই নেই।’।
















