যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি গবেষক নিয়োগ, বেতন কাঠামো এবং ভিসা ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে কঠোর তদন্ত শুরু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। জে-১ ভিসার অপব্যবহার, বিদেশি গবেষকদের তুলনামূলক কম বেতনে নিয়োগ এবং সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণায় সম্ভাব্য অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সমন পাঠিয়েছে মার্কিন শ্রম বিভাগ। গত ৮ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই তদন্তের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তদন্তে বিদেশি সরকার ও প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য প্রভাব, গবেষণার অর্থায়ন এবং সংবেদনশীল গবেষণার তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। তদন্ত কার্যক্রম জোরদার করতে শ্রম বিভাগ ‘ভিসা ফ্রড স্ট্রাইক টিম’ নামে একটি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে।
তদন্তের মূল ভিত্তি হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অভিযোগ করেছেন যে, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় জে-১ ভিসা কর্মসূচির সুযোগ গ্রহণ করে বিদেশি গবেষকদের স্থানীয় গবেষকদের তুলনায় কম বেতনে নিয়োগ দিচ্ছে। তাঁর ভাষ্যমতে, একই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে মার্কিন গবেষকেরা জে-১ ভিসায় আসা বিদেশি গবেষকদের তুলনায় বছরে গড়ে প্রায় ২০ হাজার ডলার বেশি উপার্জন করেন। মার্কিন শ্রম বিভাগের মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তদন্তের আওতায় থাকা এই নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদানপ্রাপ্ত পোস্টডক্টরাল গবেষকদের প্রায় ৬১ শতাংশই বিদেশি নাগরিক, যেখানে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই হার মাত্র ৩৮ শতাংশ। এমআইটির বক্তব্য, তাদের প্রতিষ্ঠানে জে-১ ভিসায় আসা গবেষকেরা মার্কিন সরকারের অনুমোদন নিয়েই গবেষণায় অংশ নেন।
মার্কিন শ্রম বিভাগের মহাপরিদর্শক অ্যান্থনি ডি’এসপোসিতো জানিয়েছেন, এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সমন পাঠানো হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রক্রিয়া, বেতন কাঠামো, ভিসা স্পনসরশিপের শর্তাবলি এবং গবেষণায় পাওয়া সরকারি অর্থায়নের বিস্তারিত নথি চাওয়া হয়েছে। তদন্তকারীরা মূলত জে-১ ভিসার নিয়মাবলি অনুযায়ী প্রচলিত কর্মসংস্থান ও বেতন কাঠামো বিষয়ক নীতিমালার কোনো লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। এছাড়া জে-১ ও এইচ-১বি ভিসাসহ বিভিন্ন কর্মসংস্থানসংশ্লিষ্ট ভিসা কর্মসূচিতে কোনো ধরনের জালিয়াতি আছে কি না, তাও এই তদন্তের লক্ষ্য।
জে-১ ভিসা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ভিত্তিক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিসা কর্মসূচি। এর আওতায় অনেক বাংলাদেশি গবেষকও যুক্তরাষ্ট্রে তাদের একাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এ কারণে সাম্প্রতিক এই কড়াকড়ি বাংলাদেশি গবেষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া, ভিসা স্পনসরশিপ এবং তাদের গবেষণা কার্যক্রমের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বাড়তি যাচাই-বাছাইয়ের ঝুঁকি তৈরি করেছে। তবে এখন পর্যন্ত তদন্তাধীন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জে-১ ভিসা কর্মসূচি বাতিল বা স্থগিত করার কোনো ঘোষণা আসেনি। একই সঙ্গে, বৈধ ভিসাধারীদের যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার নির্দেশ বা কোনো ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কোনো তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি। এতে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় নিয়োজিত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তদন্তের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। স্ট্যানফোর্ড, ইয়েল, ব্রাউন এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ডেভিস ক্যাম্পাস কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত অভিবাসন ও কর্মসংস্থান আইন মেনে বিদেশি গবেষকদের নিয়োগ দিয়ে থাকে এবং এই তদন্তে তারা পূর্ণ সহযোগিতা করবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সরকারি অনুদান ও ভিসা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নিয়ম লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ রাখা হবে না। এমতাবস্থায়, সংশ্লিষ্ট গবেষকদের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের ভিসার মেয়াদ, ডিএস-২০১৯ ফরম, নিয়োগপত্র এবং গবেষণা কর্মসূচির শর্তাবলি নিয়মিত হালনাগাদ রাখা জরুরি বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তদন্তের আওতায় রয়েছে হার্ভার্ড, ইয়েল, স্ট্যানফোর্ড ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিসহ (এমআইটি) দেশটির বেশ কয়েকটি খ্যাতনামা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এতে বিচার বিভাগ, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ, অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যুক্ত থাকবেন।
















