বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় ‘মব’ বা হঠাৎ সংগঠিত জনতার সংস্কৃতি একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কখনো এটি প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে, আবার কখনো অন্ধ প্রতিহিংসার হাতিয়ারে পরিণত হয়। জনজীবনের এই আচরণ মূলত সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভয়, বিচারহীনতা ও তীব্র ক্ষোভেরই প্রতিফলন। ঐতিহাসিকভাবে জনতার শক্তি ইতিবাচক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করলেও, বর্তমানে বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা ও সামাজিক বৈষম্য এই শক্তিকে সহিংস দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে ক্ষুধার্ত জনতার খাদ্যগুদাম আক্রমণের ঘটনা আমাদের ইতিহাসে জনতার এমন আচরণের অন্যতম উদাহরণ। জনতার এই আচরণ আমাদের সমাজের অন্তর্গত ভয়, ক্ষোভ এবং ন্যায়বিচারের অভাব ও প্রতিহিংসাপরায়ণতাকে প্রকাশ করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় জনতার ঐক্য ছিল মুক্তির শক্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে মবকে আরও দ্রুত সংগঠিত করে।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ লে বঁ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ক্রাউড: আ স্টাডি অব দ্য পপুলার মাইন্ড’-এ জনতার মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, সমষ্টির ভেতরে ব্যক্তি তার নিজস্ব যুক্তি ও নৈতিকতা হারিয়ে ফেলে। এই অবস্থাকে সামাজিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডিইন্ডিভিডুয়েশন থিওরি’ বা ব্যক্তিসত্তা লোপ বলা হয়। যখন কেউ জনতার স্রোতে মিশে যায়, তখন তার ব্যক্তিগত পরিচয় গৌণ হয়ে পড়ে এবং আবেগ যুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে একজন ব্যক্তি এমন সহিংস আচরণ করতে উদ্বুদ্ধ হয়, যা একা থাকা অবস্থায় সে কল্পনাও করতে পারে না। জনতার এই উন্মাদনায় দায়িত্ববোধ হ্রাস পায়, কারণ কাজের দায়ভার এককভাবে কারো ওপর বর্তায় না। লে বঁ-এর এই ধারণা, ফ্যাসিবাদী ও গণতান্ত্রিক উভয় আন্দোলনেই ব্যবহৃত হয়েছে।
বাংলাদেশে এই মব-সংস্কৃতির প্রসারে গুজব এবং বিচারহীনতার বড় ভূমিকা রয়েছে। ২০১৯ সালের ‘ছেলেধরা’ গুজবকে কেন্দ্র করে সারা দেশে বহু মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল, যা এই অন্ধ আবেগের চরম বহিঃপ্রকাশ। একইভাবে চোর সন্দেহে গ্রাম্য এলাকায় নিরপরাধ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে বিচারের অপেক্ষায় না থেকে আইন হাতে তুলে নেওয়া—এসবই মব-সংস্কৃতির অংশ। এমনকি সম্প্রতি শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ের প্রকাশকের প্রতিষ্ঠানে হামলা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রসংগঠনের আক্রমণ প্রমাণ করে যে, এই সংস্কৃতি এখন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বা স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনেও পরিচালিত হচ্ছে। এ রকম উদাহরণ আছে অজস্র—জনতা গুজব শুনে কাউকে চোর বা ছিনতাইকারী ভেবে পিটিয়ে হত্যা করে; রাজনৈতিক মিছিলে আবেগে ভেসে গিয়ে গাড়ি বা দোকান ভাঙে; খেলার মাঠে দর্শকেরা হঠাৎ সহিংস হয়ে ওঠে। শহর ও গ্রামে একইভাবে এই সংস্কৃতি বিদ্যমান। ২০১৯ সালে ‘ছেলেধরা’ গুজবে অনেক মানুষ খুন হয়।
রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও মব-সন্ত্রাসের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর পার্থক্য রয়েছে। দলীয় পতাকা, স্লোগান ও সুনির্দিষ্ট নেতৃত্বের উপস্থিতিতে যে সংঘর্ষ হয়, তা রাজনৈতিক সহিংসতা। কিন্তু মব-সন্ত্রাসের কোনো সংগঠিত কাঠামো থাকে না; বরং এটি তাৎক্ষণিক উত্তেজনা বা গুজবের ওপর ভিত্তি করে ঘটে। তবে বর্তমান সময়ে অনেক রাজনৈতিক গোষ্ঠীই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জনতাকে উসকে দিতে এই মব-সংস্কৃতিকে কৌশলে ব্যবহার করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘প্রেশার গ্রুপ’ নামে এক নতুন তত্ত্ব সামনে আসে, যা অনেক ক্ষেত্রে এই নিয়ন্ত্রণহীন মব সহিংসতাকে সামাজিক বা রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এটি মূলত প্রেশার গ্রুপের সংগঠিত চাপের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন, কারণ প্রেশার গ্রুপ সুশৃঙ্খল চাপ প্রয়োগ করে, আর মব-সংস্কৃতি হলো নিয়ন্ত্রণহীন বিশৃঙ্খলা।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পল্লী-সমাজ’ উপন্যাসেও গ্রামীণ সমাজে জনতার আবেগের অশুভ শক্তির চিত্র ফুটে উঠেছিল, যা আজও প্রাসঙ্গিক। এই মব-সংস্কৃতি যেমন আলোকিত প্রতিবাদের পথ দেখাতে পারে, তেমনি তা নিরপরাধের জীবনকেও ধ্বংস করতে পারে। আগুন যেমন আলো ও উত্তাপ দেয়, আবার সব পুড়িয়ে ছাইও করতে পারে—মব-সংস্কৃতিও ঠিক তেমনি। আমাদের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতি জনতাকে আইন হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করছে। এই সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে শুধু পুলিশি ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; বরং শক্তিশালী বিচারকাঠামো, শিক্ষার প্রসার, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা এবং যুক্তিবাদী সমাজ গঠন অপরিহার্য। জনতার এই শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে না পারলে তা সমাজকে ধ্বংসের অতলে ঠেলে দেবে, যার সংকেত ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গ্রামীণ কৃষক থেকে শহুরে শ্রমিক—সবাই একত্র হয়েছিল স্বাধীনতার জন্য।

















