পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত নবাগত জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মতবিনিময় সভায় অস্ত্র আইনের মামলায় পুলিশের অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি জাহাঙ্গীর হোসেন ফরাজীর উপস্থিতি এবং বক্তব্য রাখা নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মির্জাগঞ্জ উপজেলা অফিসার্স ক্লাবে আয়োজিত ওই সভায় জাহাঙ্গীর হোসেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ আলতাফ হোসেন চৌধুরীর প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন। সভার একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় পর্যায়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গতকালের সভায় তিনি পটুয়াখালী-১ (সদর, মির্জাগঞ্জ ও দুমকী) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ আলতাফ হোসেন চৌধুরীর প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন এবং অতিথিদের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বক্তব্য দেন। তাঁর বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিতর্ক ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। কর্মকর্তা, ছাত্র প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ইলিয়াস মিয়া সভা সঞ্চালনা করেন। পরে জাহাঙ্গীরকে মির্জাগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হয়।
পুলিশ ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর মির্জাগঞ্জ সেনা ক্যাম্পের একটি অভিযানে নিজ বাসা থেকে জাহাঙ্গীর হোসেন ফরাজীকে আটক করা হয়। সে সময় তাঁর কাছ থেকে একটি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও দুটি গুলি উদ্ধারের দাবি করে পুলিশ। এর দুদিন পর ৭ নভেম্বর মির্জাগঞ্জ থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) এনামুল হক তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করেন। এরপর ৬ ডিসেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মির্জাগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) খান নুরুল ইসলাম আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। বর্তমানে মামলাটি পটুয়াখালী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে এবং সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। এমপির বিরুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় আমাদের নীরব থাকতে হচ্ছে।’।
জাহাঙ্গীর হোসেন মির্জাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তারের পরপরই ওই বছরের ৭ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কমিটির সহদপ্তর সম্পাদক মনির হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে তাঁকে সাধারণ সম্পাদক ও প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পর, ২০২৫ সালের নভেম্বরে তৎকালীন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত আদেশে তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে পুনরায় দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক চৌধুরী আশরাফুল করীম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ মো. রাসেল। সভায় উপস্থিত ছিলেন মির্জাগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) খান নুরুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি গোলাম ফারুক মুন্সি ও আমিনুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ মুন্সি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মনিরসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
বিতর্কিত এই নেতার উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও শেখ মো. রাসেল জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরামর্শ অনুযায়ীই জাহাঙ্গীরকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘মামলাটি বেশ আগের হওয়ায় বিষয়টি আমার নজরে ছিল না।’ এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী দাবি করেন, জাহাঙ্গীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার। তিনি বলেন, ‘অনেকে ভালো মানুষকে চোর বানিয়ে ফেলে। তাঁর কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না, কীভাবে পেল বা কোথায় পেল তা জানি না।’
ঘটনাটি নিয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান বলেন, পুলিশের চার্জশিটভুক্ত আসামি জাহাঙ্গীর হোসেনের এ ধরনের জনসভায় অংশগ্রহণ এবং বক্তব্য দেওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিতর্কিত। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা আক্ষেপ করে জানান, জাহাঙ্গীর সংগঠনের নীতিমালা বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকলেও সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করায় তাঁরা নিরুপায় হয়ে নীরব রয়েছেন। এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে জাহাঙ্গীর হোসেন ফরাজীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

















