কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি গত ৭ ও ৮ সেপ্টেম্বর চীন সফর করেছেন। বেইজিং ও দোহা উভয়ই এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেছে। চীনা কর্মকর্তাদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন এক ‘স্বর্ণযুগে’ প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
বর্তমান সময়ে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অস্থিরতা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন এক জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সমন্বয়কে আরও জোরদার করেছে।
সফর শেষে দুই দেশ জ্বালানি, বিনিয়োগ এবং উন্নত প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিডিয়া ও যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক ইব্রাহিম বিন সুলতান আল-হাশমি ৮ সেপ্টেম্বর দোহায় সাংবাদিকদের জানান, যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি আরও বলেন, এই সংকট নিরসনে কাতার তার অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা চীন ও কাতার—উভয়ের জন্যই উদ্বেগের কারণ। বিশ্বের অন্যতম প্রধান এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার এবং বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক চীন উভয়েই জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে সম্পন্ন হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও কাতার চীনকে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়েছে।
দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত। গত বছর চীন ও কাতারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩৮০ কোটি ডলার। ২০২৫ সালে কাতার চীনকে ১ কোটি ৯৪ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করেছে, যা দেশটিকে চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারীতে পরিণত করেছে। এছাড়া কাতারএনার্জি চীনের সিএনপিসি ও সিনোপেকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী ২৭ বছরের এলএনজি সরবরাহ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং নর্থ ফিল্ড গ্যাস প্রকল্পে অংশীদারিত্ব গড়েছে।
ইরান ইস্যুতে চীন ও কাতারের কৌশলে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও লক্ষ্য অভিন্ন। চীন কাতারের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানিয়ে আসছে এবং সামরিক শক্তির পরিবর্তে সংলাপের ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে, কাতার সরাসরি তেহরানের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানালেও সংকট নিরসনে আলোচনার পথ খোলা রাখতে কাজ করছে। চীন ও কাতারের এই ঘনিষ্ঠ সমন্বয় তেহরানের ওপর প্রভাব বিস্তারে দোহাকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
তবে এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের আল উদেইদ সামরিক ঘাঁটি অবস্থিত এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে দোহার দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদারত্ব রয়েছে। ৩ মার্চ ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র আল উদেইদ ঘাঁটির কাছে আঘাত হানার পর কাতার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। চীন অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা নিয়ে কাতারের নিরাপত্তার প্রধান নিশ্চয়তাদাতা হওয়ার কোনো আগ্রহ প্রকাশ করেনি।
জ্বালানি খাতের বাইরেও চীন ও কাতারের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত হচ্ছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অর্থ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কাতারের প্রধানমন্ত্রী আল থানিও উচ্চপ্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।
বর্তমানে কাতারে ৫২০টি চীনা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইনভেস্ট কাতারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে এসব কোম্পানির বিনিয়োগ প্রকল্পের মূল্য ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং এর মাধ্যমে ৩ হাজার ২০০টিরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
পরিশেষে, ইরানকে ঘিরে চলমান আঞ্চলিক অস্থিরতা চীন ও কাতারের মধ্যে সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে দুই দেশ তাদের কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও গভীর করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে কাতারকে ‘গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে বিবেচনা করে চীন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তার ভাষায়, এই অবস্থা অঞ্চল, আঞ্চলিক দেশ ও সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনছে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সময়ে কাতার চীনকে জানিয়েছে, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা জ্বালানি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় কেন ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩.৮ বিলিয়ন বা ২৩৮০ কোটি ডলার। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ সম্পর্ক শুধু জ্বালানি কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইরান প্রশ্নে একই স্বার্থ, ভিন্ন কৌশল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা কিংবা জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার ঘটনায় বেইজিং সরাসরি তেহরানের সমালোচনা থেকে অনেকটাই বিরত থেকেছে।













