ইরানে গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ২০ বছর বয়সী যমজ বোন তারানেহ রাহিমি ও রোমিনা রাহিমির ওপর কারাগারে ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রীয় ইরানের ইসফাহানে বিক্ষোভের ঘটনায় ১৬ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় এই দুই বোনকেও আসামি করা হয়। চার মাস নিখোঁজ থাকার পর যখন তাদের মা মারজিয়েহ নুরমোহাম্মাদি মে মাসে দৌলতাবাদ কারাগারে মেয়েদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান, তখন তাদের শারীরিক অবস্থা দেখে তিনি স্তব্ধ হয়ে যান। পরিবারের ভাষ্যমতে, নির্যাতনের কারণে তাদের চেহারা এতটাই বদলে গিয়েছিল যে মা প্রথমে তাদের চিনতেই পারেননি।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত তাদের চাচাতো ভাই মাসুদ নুরমোহাম্মাদির দাবি, কারাগারে দুই বোনকে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তাদের মুখমণ্ডল ফুলে গিয়েছিল, শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং চুলের বড় একটি অংশ ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল। তারানেহকে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করার জন্য কর্তৃপক্ষ তার যমজ বোন রোমিনাকে যৌন নির্যাতনের হুমকি দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। চাপের মুখে তারানেহ এমন একটি স্বীকারোক্তিতে সই করতে বাধ্য হন, যা পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে মামলায় মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
তারানেহের শারীরিক অবস্থা নিয়ে পরিবার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তার আগে পায়ে অস্ত্রোপচার হয়েছিল এবং সেখানে ধাতব প্লেট ও স্ক্রু বসানো ছিল। পরিবারের দাবি, কারাগারে নির্যাতনের ফলে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। কারাগারের একজন চিকিৎসক তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা করেনি। দুই বোনের বিরুদ্ধে ‘মোহরাবেহ’ বা ‘সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ’সহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া বিক্ষোভের সময় একটি জুতার দোকানের কাছে মলোটভ ককটেল তৈরির অভিযোগও তাদের ওপর চাপানো হয়েছে, যদিও পরিবার এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।
আইনি লড়াইয়ের অংশ হিসেবে তাদের আইনজীবীরা মামলার নথি পর্যালোচনা করছেন এবং আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই বোনের বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। এছাড়া নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে আইনজীবীদের করা আবেদন এখনো ইসফাহানের আদালতে কোনো অগ্রগতি পায়নি। কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভের সময় দুজনের মৃত্যুর জন্যও তাদের দায়ী করার চেষ্টা করছে, যদিও সরাসরি হত্যার অভিযোগ আনা হয়নি।
বর্তমানে তারানেহকে মৃত্যুদণ্ড এবং রোমিনাকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের পরিবার এখন এই সাজা বাতিল ও পুনর্বিচারের দাবি জানাচ্ছে। এই ঘটনা ইরানে বিক্ষোভকারীদের বিচারপ্রক্রিয়া, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় এবং মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইরানে বিক্ষোভকারীদের আটক ও নির্যাতনের বিষয়ে সরব রয়েছে, যা এই মামলার মাধ্যমে আবারও সামনে এল।














