বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ ভাণ্ডারে নানা প্রবাদ-প্রবচন ও বাগধারা আমাদের নিত্যদিনের যাপিত জীবনের প্রতিফলন ঘটায়। এর মধ্যে ‘ঘোলা জলে মাছ শিকার’ কথাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে যে পরিস্থিতি দৃশ্যমান হচ্ছে, তা যেন এই প্রবাদের এক বাস্তব রূপ। একদিকে দেশে আমানতকারীর সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে, অন্যদিকে বিপুল অংকের মূলধন ঘাটতিতে পড়ে ধুঁকছে দেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংক। বাংলা ভাষা নানা উপাদানে পুষ্ট হয়েছে। যার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে প্রবাদ-প্রবচন। ‘ঘোলা জলে মাছ শিকার’ প্রবাদটি সেই সব মেধাবী শিকারিদের জন্য প্রযোজ্য, যারা প্রতিকূল পরিবেশেও নিজের স্বার্থ বুঝে নিতে প্রাজ্ঞ। কিন্তু যত প্রতিকূলতা, যত প্রতিবন্ধকতা তাদের পথ আটকানোর চেষ্টা করুক, তারা ঠিকই সম্মুখের সকল বাধা পার হয়ে নিজের মোক্ষ লাভ করবেই। ব্যাংকে বড় অঙ্কের জমা একদিকে ব্যাংকের তরল অর্থের জোগান বৃদ্ধি করে, অন্যদিকে আবার বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতির ইঙ্গিত দেয়।
চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশে ১ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টিতে। এসব হিসাবে জমা থাকা অর্থের পরিমাণ প্রায় পৌনে ৯ লাখ কোটি টাকা। এই তথ্যটি নিয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর ‘ঠিকানা’ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ‘দেশে কোটিপতি ১৪১৫৬২!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। এই বিপুল আমানতের প্রায় ২৮ থেকে ২৯ শতাংশ ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং বাকি অংশ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবের আওতাভুক্ত। শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘দেশে কোটিপতি ১৪১৫৬২।
পরিসংখ্যান বলছে, আমানতকারীর এই উল্লম্ফন বেশ দ্রুত। চলতি বছরের প্রথম তিন মাস অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ১ কোটি ১ টাকা ও তদূর্ধ্ব আমানত হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরও ৫ হাজার ৭৭ জন নতুন আমানতকারী। এক দিকে যখন এই ধনাঢ্য শ্রেণির সংখ্যা বাড়ছে, ঠিক তখনই মুদ্রার উল্টো পিঠে রয়েছে ভয়াবহ এক চিত্র। একই সময়সীমার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের ২১টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে আলাদাভাবে ‘মূলধন খুইয়ে চরম বিপাকে ২১ ব্যাংক’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। তারা চালাক, ধূর্ত না বুদ্ধিমান—বিশ্লেষণ করে পৃথক করা কঠিন।
গত ৫ আগস্ট চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পর দেশের ব্যাংকিং খাতের ভেতরের অন্ধকার দিকগুলো স্পষ্টভাবে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণকারী কিছু প্রভাবশালী মহল আমানতকারীদের অর্থকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করে লাগামহীন লুটপাট চালিয়েছে। এই অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই ব্যাংকগুলো আজ প্রায় ফোকলা হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত আমানত সুরক্ষিত রাখার পরিবর্তে মুষ্টিমেয় কিছু অর্থলিপ্সু গোষ্ঠী নিজেদের আখের গোছাতে গিয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই তেলেসমাতি কারবারের খেসারত এখন পুরো দেশ ও সাধারণ আমানতকারীদের দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থ, ব্যবসা-বাণিজ্যের বেহাল দশার মধ্যেও যখন কোটিপতির সংখ্যাবৃদ্ধির খবর শুনতে পাওয়া যায়, তখন সেই কথাটাই কেবল মনে পড়ে, কী তেলেসমাতি কারবার। কোটিপতির হিসাব ও বড় অঙ্কের আমানত বৃদ্ধির প্রবণতার ভালো-মন্দ দুই দিকই আছে।
















