গত ৩০ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন দুটি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। অথচ প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলন ছিল ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। কাজ শুরুর আগেই ব্যয় বৃদ্ধির এই হার শতভাগের বেশি, যা নিয়ে খোদ সরকারি কারিগরি কমিটিও ব্যয় বৃদ্ধিকে যৌক্তিক বলে প্রতিবেদন দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৬ বছরে দেশজুড়ে অতিমূল্যায়িত প্রকল্পের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা যেন এখনো অব্যাহত রয়েছে।
এর আগে এমআরটি লাইন-৬ নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, যেখানে একই সময়ে দিল্লি মেট্রো নির্মিত হয়েছে প্রতি কিলোমিটার গড়ে ৩০০ কোটি টাকায়। একইভাবে ১০ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু শেষ পর্যন্ত ৩১ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া পদ্মা সেতুর রেলসংযোগ প্রকল্পে ১৭২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ২৩২ কোটি টাকা। ইউরোপের উচ্চগতির ট্রেনের লাইন নির্মাণের খরচের সঙ্গে এটি তুলনীয়, অথচ এই ঋণের বোঝা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
কুড়িল থেকে কাঞ্চন পর্যন্ত ৩০০ ফুট রাস্তা নির্মাণের কয়েক মাসের মধ্যেই তা ভেঙে ১৪ লেন পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে তৈরির ঘটনাটিও ছিল অর্থের অপচয়। সাড়ে ১২ কিলোমিটারের এই প্রকল্পে প্রায় ২০-২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোতে ঋণদাতা হিসেবে জাপানের জাইকা যুক্ত থাকে। জাইকার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে পরামর্শক ও ঠিকাদার উভয়ই জাপানি হওয়ায় সেখানে এক ধরনের চৌরসন্ধি কাজ করে। এছাড়া দরপত্র দলিলে এমন সব শর্ত ও প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়, যা কেবল জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোই পূরণ করতে পারে। বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ বিভিন্ন প্রকল্পে নকশা পরিবর্তন ও ক্ষতিপূরণের নামে ব্যয় বাড়ানোর কৌশলও পুরনো।
মেট্রোরেল ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে সহায়ক হলেও তা সীমিত সংখ্যক মানুষের যাতায়াতের সুযোগ করে দেয়। বর্তমানে এমআরটি-৬ লাইনে দৈনিক ৩ লাখ ৮২ হাজার যাত্রী চলাচল করে, যেখানে বাসে যাতায়াত করে প্রায় এক কোটি মানুষ। যানজটের মূল কারণ বাসমালিকদের অরাজকতা এবং রিকশার উচ্ছৃঙ্খল আচরণ। এসব সমস্যার সমাধান না করে কেবল আকাশ বা পাতালপথে বিপুল ব্যয়ে মেট্রোরেল তৈরি করে শহরকে বাসযোগ্য করা সম্ভব নয়।
অতিমূল্যায়িত প্রকল্পের এই ফাঁদ থেকে মুক্তি পেতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি
- জাইকার অর্থায়নে চলমান মেট্রোরেল প্রকল্পগুলো যে পর্যায়ে আছে, সেখানেই বাতিল করা উচিত। জাইকাকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনীয় ব্যয়ে প্রকল্প প্রস্তাব আনলে তবেই তা বিবেচনা করা হবে।
- নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে অলাভজনক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বাসমালিকদের আন্তঃজেলা পরিবহনে উৎসাহিত করে পর্যায়ক্রমে পাঁচ হাজার বৈদ্যুতিক বাস নামাতে হবে। ২৫ হাজার কোটি টাকায় এই বাসগুলো আনা সম্ভব, যা চার্জ করার জন্য গভীর রাতে ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে।
- ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা সীমিত করে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করতে হবে। চালকদের প্রশিক্ষণের আওতায় এনে ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
- ফুটপাত ও রাস্তা দখলমুক্ত করতে হবে। ফুটপাত কেবল মানুষের হাঁটার জন্য এবং রাস্তা যানবাহন চলাচলের জন্য নির্ধারিত রাখতে হবে; কোনোভাবেই দোকানদারি বা অন্য কাজে তা ব্যবহার করা যাবে না।
পরিশেষে, সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের মতে, এসব মতামত একান্তই লেখকের নিজস্ব। মেগা প্রকল্পের নামে ঋণের বোঝা চাপিয়ে উন্নয়নের যে ধারা তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে টেকসই ও যৌক্তিক অবকাঠামো নির্মাণের দিকে নজর দেওয়া এখন সময়ের দাবি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সব খবরেরই সুর হচ্ছে, এই ব্যয় অত্যধিক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে আমরা অতিমূল্যায়িত প্রকল্পে অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চীনা ঋণে এই রেললাইন তৈরি হয়েছে, চীনারা নিজ দেশে ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে চলার রেললাইন বানায় এই দরে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রেলের আয় থেকে এই ঋণের সুদ পরিশোধ সম্ভব হবে না কোনো দিন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ১৫ বছর পর হয়তো এর সেবার জন্য বাজার তৈরি হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শিক্ষায় বৈষম্য ও আগামী দিনের মেগা প্রকল্প। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাঝে চার লেন আর দুই পাশে চার লেন নিয়ে কুড়িল থেকে কাঞ্চন যাওয়ার চমৎকার রাস্তা ছিল, যার ডাকনাম ৩০০ ফুট রাস্তা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেতুগুলোর নিচ দিয়ে ইউটার্ন বানিয়ে দিলেই হতো, যানজটের আশঙ্কা থাকত না।












