দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগের পর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ছাত্রসংগঠনগুলোর খবরদারি এক পুরোনো সংস্কৃতির রূপ নিয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্যরা নিজ যোগ্যতায় নয়, বরং রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের সমর্থন ও আশীর্বাদে চেয়ারে বসেন, যা উচ্চশিক্ষার মূল কাঠামোর ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। ঠিক পুরোনো কাঠামোর মতোই উপাচার্যের চেয়ারে কে বসবেন, কীভাবে বসবেন, বসে কী করবেন, তা ঠিক করে দিচ্ছেন ছাত্রনেতারা।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ দেখা গেছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট)। সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা তীব্র আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। তাদের দাবি ছিল উপাচার্যের নিয়োগ বাতিল করে পূর্বের উপাচার্যকে বহাল রাখা। এমন উত্তাল পরিস্থিতিতেও ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সহায়তায় তালা ভেঙে উপাচার্য দপ্তরে প্রবেশ করেন। এই পুরো বিষয়টি সরকারের অগোচরে ঘটেনি, বরং প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরপর এ তিনটি উদাহরণ দেওয়ার উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়। তিনটি ঘটনায় তিনটি ভিন্ন সংগঠন, তিনটি ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি দুটি ভিন্ন সরকারের সময়।
এ ধরনের পরিস্থিতির নজির আরও রয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষকে শপথ পাঠ করিয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। আবার জুলাই ২০২৫-এ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ইয়াহ্ইয়া আখতারের কার্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের হট্টগোলের সময় তাঁদের বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘আপনি নিজ যোগ্যতায় উপাচার্য পদে বসেননি, আপনাকে আমরা বসিয়েছি, আপনি আমাদের কথা শুনতে বাধ্য।’ এসব ঘটনা প্রমাণ করে, সরকার বা দল পরিবর্তনের সাথে সংগঠনের নাম বদলালেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর খবরদারির চর্চায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। গত বছরের জুলাইয়ে এই উপাচার্যের কার্যালয়ে এক শিক্ষকের পদোন্নতি আটকাতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতা গিয়ে হট্টগোল করেন। সে সময় তাঁদের বলতে শোনা যায়, ‘আপনি নিজ যোগ্যতায় (উপাচার্য পদে) বসেননি, আপনাকে আমরা বসিয়েছি, আপনি আমাদের কথা শুনতে বাধ্য।’ (৫ জুলাই ২০২৫, )।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার প্রচলিত আইন অনুযায়ী উপাচার্য নিয়োগ দেয় আচার্য এবং উপাচার্য হলেন সেই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধান। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, উপাচার্যদের চেয়ার এমন কাদামাটির ওপর বসানো যে, ছাত্রসংগঠনগুলোর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরই তাদের টিকে থাকা নির্ভর করে। যখনই উপাচার্যরা কোনো সংকটে পড়েন বা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির মুখোমুখি হন, তখন তাদের রক্ষার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনগুলোর হাতে। এর বিনিময়ে উপাচার্যরা পছন্দের ব্যক্তিদের টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া, শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া কিংবা আবাসিক হল দখলের সুযোগ করে দেন।
চুয়েটের ক্ষেত্রেও সরকার দৃশ্যত নিশ্চুপ থেকেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও গণমাধ্যমে আসা খবরগুলো আমলেই নেয়নি। উল্টো নিয়ম ভেঙে অনলাইনে যোগদান করানো এবং শিক্ষকদের বেতন বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপের পর উপাচার্যকে চেয়ারে বসানোর দায়ভার ছাত্রসংগঠনের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যেখানে শিক্ষার্থীদের নৈতিক আন্দোলনে ছাত্রসংগঠনগুলোর পাশে থাকার কথা, সেখানে তারা উল্টো শিক্ষার্থীদের দাবির বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। আরেক দল শিক্ষার্থীদের চাওয়া–পাওয়ার বাইরে গিয়ে উপাচার্যকে চেয়ারে বসিয়ে দিচ্ছে।
এই ক্ষমতার বলয় এবং দলীয় আনুগত্যের কারণে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেধাচর্চার চেয়ে দলীয় প্রভাব বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষক রাজনীতির একাংশ দলীয় পরিচয়কে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করায় তারা ছাত্রসংগঠনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে উপাচার্যরা নিজের চেয়ারের জন্য ছাত্রসংগঠনগুলোর কাছে ঋণী হয়ে পড়েন, যার ফলে তাদের কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো নৈতিক শক্তি থাকে না।
বর্তমানে চুয়েটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মৌলিক অধিকার হুমকির মুখে পড়েছে। এই অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক দাপট অব্যাহত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও পরিবেশ চরমভাবে ব্যাহত হবে। শিক্ষার্থীদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে একটি দখলমুক্ত ও যোগ্যতাসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এবার উপাচার্য নিয়োগে কেবল খেয়ালখুশিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
উচ্চশিক্ষার এই ভঙ্গুর কাঠামো টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। বিশেষ করে যেখানে উপাচার্যরা চেয়ারের মোহে নিজেদের বিবেক হারিয়ে ফেলেন এবং ছাত্রনেতাদের কথায় ওঠবস করেন, সেখানে উচ্চশিক্ষার বাতিঘর আলোহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। গবেষক ড. নাদিম মাহমুদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত ক্ষমতার মালিক সাধারণ শিক্ষার্থীরা, আর এটি বুঝতে ব্যর্থ হলেই উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য অর্জিত হবে না।














