Wednesday , 21 October 2026 | [bangla_date]
  1. অন্যান্য
  2. আন্তর্জাতিক
  3. ই-পেপার
  4. খেলা
  5. জনপ্রিয়
  6. জাতীয়
  7. দুর্যোগ
  8. দেশের খবর
  9. বাণিজ্য
  10. বিনোদন
  11. রাজনীতি

প্রকাশ্যে এল মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল দলিল

প্রতিবেদক

October 21, 2026 10:50 am

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল পাঠ আনুষ্ঠানিকভাবে তুরস্কের পার্লামেন্টে পেশ করেছে আঙ্কারা। লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এই চুক্তির মূল পাঠের তথ্য প্রকাশ করেছে। গত আগস্টে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে একটি নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা জোট তৈরি হয়, যা স্বাক্ষরকারী দেশগুলোকে একে অপরের সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে। চুক্তিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, জোটভুক্ত কোনো দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বা আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর সশস্ত্র হামলা হলে অন্য অংশগ্রহণকারী দেশগুলো একে অপরকে সাহায্য করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে।

চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ‘পক্ষের’ আঞ্চলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানা হুমকি বা বিপদের মুখে পড়ে, তবে ‘পক্ষগুলো’ সেই হুমকি বা বিপদ দূর করতে প্রয়োজনীয় সব পথ অবলম্বন করবে।

এর মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলকে সরাসরি হুমকি হিসেবে চিহ্নিত না করা হলেও, সদস্য দেশগুলোর সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় তৈরির লক্ষ্য স্পষ্ট হয়েছে।

এই চুক্তি অনেকটা ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর মতো।

চুক্তির ২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাইরে থেকে কোনো ‘পক্ষের’ ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হলে তা সব ‘পক্ষের’ ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।

একই অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে, যদি কোনো ‘পক্ষ’ অন্য কোনো দেশ বা জোটের মাধ্যমে সশস্ত্র হামলা বা সামরিক আগ্রাসনের শিকার হয়, তবে অন্য ‘পক্ষগুলো’ তাৎক্ষণিকভাবে আক্রান্ত দেশকে সাহায্য করবে এবং একে অপরকে দেওয়ার মতো সব ধরনের সহযোগিতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করবে।

এই উদ্দেশ্যে, জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকার বাস্তবায়নের জন্য সাহায্য চাওয়ার পর একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে সহায়তার পরিধি ও ধরণ নির্ধারণ করা হবে।

এই চুক্তির ২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘পক্ষগুলো‘ প্রতিরক্ষা, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং নিরাপত্তা ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে; নিজ নিজ সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক বাড়াবে এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করার জন্য সম্মত হওয়া বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এছাড়া প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন, সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং একে অপরকে সামরিক সরঞ্জাম, জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় সম্পদ সরবরাহের বিষয়েও সম্মত হয়েছে দেশগুলো। ১৬টি অনুচ্ছেদবিশিষ্ট এই চুক্তির নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদ বা সমাপ্তির তারিখ নেই। চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর অন্তত ১০ বছর পার হলে তবেই কোনো দেশ এতে থেকে নাম প্রত্যাহার করতে পারবে। প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রযুক্তি ভাগাভাগি, যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়ন, যৌথ উৎপাদন এবং নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর মধ্যে সহযোগিতায় সাহায্য করা হবে। ক) প্রতিরক্ষা খাতে যৌথ উৎপাদনকে উৎসাহিত করা। খ) বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয় এমন প্রযুক্তিতে যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন বাস্তবায়ন করা। এই কমিটির বৈঠক বছরে দুবার অনুষ্ঠিত হবে এবং দেশগুলো পর্যায়ক্রমে আয়োজক হবে। সরঞ্জাম ও রসদ সহায়তার প্রাপ্যতা ও উপযোগীতার ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধ, শান্তি কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে দেশগুলো একে অপরকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি, খুচরা যন্ত্রাংশসহ প্রয়োজনীয় রসদ সহায়তা দেবে।

চুক্তি বাস্তবায়নের কৌশলগত কাঠামো

  1. চুক্তি বাস্তবায়নে কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেওয়া, নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো এবং বাধা দূর করতে প্রধান দেশগুলো (কোর পার্টিস) একটি ‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’ গঠন করবে। এতে সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানগণ থাকবেন।
  2. প্রয়োজন মনে করলে এই কমিটি সাব-কমিটি গঠন করতে পারবে।
  3. চুক্তির বিষয়গুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজন অনুযায়ী দেশগুলোর মধ্যে আলাদা চুক্তি বা প্রোটোকল সই হতে পারে।
  4. প্রধান দেশগুলোর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নতুন কোনো দেশের এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার নিয়ম ও নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা কমিটির থাকবে।
  5. কমিটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সৌদি আরবে একটি স্থায়ী সচিবালয় থাকবে। সচিবালয় পরিচালন সংক্রান্ত নিয়ম, কাঠামো ও মূল নীতিগুলো পরে প্রধান দেশগুলোর সর্বসম্মতিতে ঠিক করা হবে।
  6. সচিবালয়ের প্রধান হবেন একজন মহাসচিব, যিনি তিন বছরের মেয়াদে প্রধান দেশগুলোর মধ্যে পর্যায়ক্রমে নিযুক্ত হবেন। প্রথম মহাসচিব হবেন পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের একজন নাগরিক।
  7. এই অনুচ্ছেদের নিয়মগুলো দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান অন্যান্য সামরিক সহযোগিতা কমিটির কাজে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

গোপনীয়তা রক্ষা

  1. এই চুক্তির মাধ্যমে পাওয়া সমস্ত গোপন তথ্য ও দলিলের গোপনীয়তা দেশগুলো রক্ষা করবে এবং জাতীয় আইন মেনে চলবে।
  2. এসব গোপন তথ্য ও দলিল অন্য কোনো রাষ্ট্র, কোম্পানি বা ব্যক্তির সাথে শেয়ার করা যাবে না।
  3. কেবল যাদের জানা জরুরি (নিড-টু-নো) এবং যাদের উপযুক্ত নিরাপত্তা ছাড়পত্র আছে, তারাই এসব গোপন তথ্য দেখার সুযোগ পাবেন।

আইনি প্রক্রিয়া ও কার্যকরীকরণ

  1. নিজ নিজ দেশের আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী চুক্তিটি অনুমোদিত হতে হবে। সচিবালয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের দলিল জমা দেওয়ার দিন থেকে চুক্তিটি কার্যকর হবে।
  2. এই চুক্তি অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যকর থাকবে।
  3. চুক্তি কার্যকর হওয়ার ১০ বছর পর, যেকোনো দেশ কূটনৈতিক মাধ্যমে অন্তত ৩ মাস আগে লিখিত নোটিশ দিয়ে বের হয়ে যেতে (অব্যাহতি নিতে) পারবে।
  4. চুক্তির সমাপ্তি বা কোনো দেশের বের হয়ে যাওয়া—পূর্বে গৃহীত ও চলমান কোনো প্রকল্প বা কার্যক্রমকে প্রভাবিত করবে না।
  5. গোপন তথ্য সুরক্ষার দায়িত্ব চুক্তি শেষ হওয়ার পরও বজায় থাকবে।

চুক্তিতে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা করবে।

তারা নিজ নিজ এবং যৌথ স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেছে।

একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, সার্বভৌম সমতা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে এই জোট কাজ করবে।

এছাড়া সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যকার বিদ্যমান সহযোগিতা আরও গভীর করার ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান নেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে ‘পক্ষগুলোর‘ মধ্যকার সমন্বয় বজায় থাকবে। প্রধান দেশগুলোর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ও আলোচনার মাধ্যমে এই চুক্তি সংশোধন করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিটি বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রভাব বিস্তারে এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মক্কা চুক্তি: নয়া আঞ্চলিক নিরাপত্তার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ।

সর্বশেষ - দেশের খবর