টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার সুইটি আক্তার সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির একজন। সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কপি চেয়েছে ঢাকা।
সম্প্রতি সৌদি আরবের মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এরপর হঠাৎ একদিন মেয়ে ফোন করে জেলে বন্দী থাকার কথা জানায়।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) গত ১৪ অক্টোবর (বুধবার) এই দণ্ড কার্যকরের বিষয়টি নিশ্চিত করে।
সুইটি আক্তারের সঙ্গে একই দণ্ড পেয়েছেন নজরুল ইসলাম নামের আরেক বাংলাদেশি নাগরিক। তবে নিজের সন্তানের বিরুদ্ধে আনা এই গুরুতর অভিযোগ পরিবারের সদস্যরা মোটেও বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাঁদের দাবি, সুইটি কোনোভাবেই এমন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন না, বরং তিনি কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন তিনি।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, সুইটির জীবন ছিল সংগ্রামমুখর। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তাঁর বিয়ে হয়, কিন্তু সেই সংসার স্থায়ী হয়নি। পরে বাবার সংসারে ফিরে আসা সুইটি পরিবারের চাপে দ্বিতীয়বার বিয়ে করলেও সেই স্বামী সৌদি আরব গিয়ে আর যোগাযোগ রাখেননি। পরিবারের অভাব দূর করতে এবং নিজের নয় বছর বয়সী মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সুইটি ২০২৩ সালের মার্চ মাসে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় তিনি গ্রেপ্তার হন। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে চলে আসেন বাবার বাড়িতে। কোনোরকমে নিজেকে সামলে বললেন, ‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে। একপর্যায়ে বললেন, ‘মা তুই কত দুঃখ পাইয়া গেছস, কেউর কাছে কইলি না। আমার কাছেও কইলি না…আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও। পরে বলেন, ‘আমার চাচায় মাটি কাইট্যা ভাত খায়। সৌদিতে যাওয়ার পর প্রায় ছয় মাস মেয়ের সঙ্গে তাঁদের নিয়মিত কথা হতো।
সুইটি কারাগারে থাকা অবস্থায় পরিবারের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যোগাযোগ রাখতেন। পরিবারের দাবি, সৌদি আরবে কাজ করার সময় সুইটির কয়েকজন সহকর্মী অবৈধভাবে একটি গাড়ি কিনেছিলেন, আর সেই ঘটনার সূত্র ধরেই সুইটিকে অন্যদের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারে থাকাকালীন সুইটি মাঝে মাঝে মা-বাবার সঙ্গে কথা বলতেন। কথা বলতে না পারলে তিনি তাদের দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করতেন। সবশেষ গত ১৩ অক্টোবর (মঙ্গলবার) মাগরিবের নামাজের পর সুইটির সঙ্গে তাঁর বাবার সর্বশেষ কথা হয়। তবে ওই সময় তিনি বিচার বা মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার বিষয়ে পরিবারের কাছে কিছুই জানাননি। এর ঠিক দুই দিন পরই তাঁর মৃত্যুর সংবাদ আসে। কী করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে সুইটি আক্তারের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, উঠানে কয়েকজন জড়ো হয়ে কথা বলছেন।
সুইটির মা জহুরা বেগম মেয়ের মৃত্যুর খবরে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে কেবল মেয়ের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানাচ্ছেন। সুইটির চাচাতো বোন সালমা আক্তার জানান, সুইটির দ্বিতীয় স্বামী সৌদি গিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পর সুইটি নিজের ভাগ্য বদলাতে বিদেশে গিয়েছিলেন। সালমা আক্তার বলেন, সুইটির কোনো ছেলে সন্তান নেই, কেবল একটি মেয়ে আছে যে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। সুইটি যে এভাবে চিরতরে হারিয়ে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। তাঁর মেয়ে (৯) স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। দ্বিতীয় বিয়ের পর ধারদেনা করে জামাতাকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়।
মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহুরুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি প্রশাসন অবগত হয়েছে। সুইটির বাড়িতে স্বজন ও প্রতিবেশীরা ভিড় করছেন। অভাবের সংসারের হাল ধরতে গিয়ে প্রবাসে গিয়ে এমন পরিণতিতে এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে সুইটির পরিবারে। এদিকে, এই দণ্ড কার্যকরের রায় ও মামলার নথিপত্র চেয়ে ঢাকায় যোগাযোগ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সুইটির বাবা মো. ফজল মিয়া এখন কেবল মেয়ের শেষ স্মৃতি হিসেবে মরদেহটি একবার দেখতে চান। সুইটির মা–বাবা তখন ঘরের বারান্দায় বসে ছিলেন।














