Friday , 16 October 2026 | [bangla_date]
  1. অন্যান্য
  2. আন্তর্জাতিক
  3. ই-পেপার
  4. খেলা
  5. জনপ্রিয়
  6. জাতীয়
  7. দুর্যোগ
  8. দেশের খবর
  9. বাণিজ্য
  10. বিনোদন
  11. রাজনীতি

ঠাকুরগাঁওয়ে বনবিড়ালের দেখা: বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই

প্রতিবেদক

October 16, 2026 6:59 am

ঠাকুরগাঁওয়ে অবস্থিত বেসরকারি সংস্থা ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) প্রধান কার্যালয়ের বিশাল চত্বরে দুর্লভ প্রজাতির গাছের একটি উদ্যান গড়ে তোলার প্রকল্প নিয়ে আমি গত দুই বছর ধরে কাজ করছি। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামানের অনুরোধে কয়েক একর জমিতে দেশের সব প্রজাতির গাছের অন্তত দুটি করে চারা রোপণের কাজ চলছে। এই কাজের অংশ হিসেবেই অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমি সেখানে নতুন চারা রোপণ ও পূর্বের রোপণ করা গাছের অবস্থা পরিদর্শনে যাই।

সেই সফরে বিখ্যাত আলোকচিত্রী রেজাউল হাফিজ রাহীর সঙ্গে ইএসডিওর জমিতে খ্যাঁকশিয়াল দেখতে যাই। রাহীর সঙ্গে খ্যাঁকশিয়ালদের এক অদ্ভুত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সেখানে আমরা খুব কাছ থেকে এক জোড়া খ্যাঁকশিয়ালকে নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরা করতে দেখি। কিন্তু হঠাৎ করেই প্রায় ২০০ গজ দূরে বড় একটি প্রাণীকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। প্রথমে সূর্যের আলো বিপরীত দিকে থাকায় প্রাণীটিকে পাতিশিয়াল মনে হলেও, পরক্ষণেই বুঝতে পারি এটি একটি বনবিড়াল। পরবর্তীতে তোলা ছবি দেখে এর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়। আমাদের খুব কাছেই একটি স্ত্রী খ্যাঁকশিয়াল বসে আছে, হাঁটাহাঁটি করছে। যেখানে বনবিড়ালটির দেখা পেলাম, সেই এলাকাটি একটি নদীর ধারে। যে জঙ্গলে বনবিড়ালটির দেখা পেলাম, সেটি আর কত দিন টিকে থাকবে, তা বলা কঠিন।

বনবিড়ালটি যে এলাকায় দেখা মিলেছে, তা নদীর ধার ঘেঁষে অবস্থিত। আশপাশে আখের খেত ও জঙ্গল থাকায় জায়গাটি বেশ নির্জন ও নিস্তব্ধ। বনবিড়ালটি একসময় মাটিতে বসে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে আবার জঙ্গলের গভীরের দিকে চলে যায়। প্রায় চল্লিশ বছর আগে বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে বনবিড়াল খুব পরিচিত প্রাণী ছিল, যা হাঁস-মুরগি কিংবা ছাগলের বাচ্চা শিকার করত। অঞ্চলভেদে এটি রংপুরের কোথাও ‘গাড়োয়া’ আবার কোথাও ‘বাড়বিলাই’ নামে পরিচিত ছিল। গ্রামের জঙ্গল বা বাঁশঝাড় ছিল এদের পছন্দের আশ্রয়স্থল। এটি যে পোষা বিড়াল নয়, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। গ্রামের বাড়ি থেকে সামান্য দূরে থাকা জঙ্গল কিংবা বাঁশঝাড়ে বনবিড়াল আশ্রয় নিত। সন্ধ্যায় ‘বাব, বাব’ স্বরে একধরনের ডাক দিত। এমনও হতে পারে, এটাই ছিল আমার শেষ দেখা।

তবে কুসংস্কার ও অজ্ঞতার কারণে এই প্রাণীটিকে অনেকে এখনো অমঙ্গল মনে করেন। যদিও বনবিড়ালের মাংস খেলে বিষব্যথা কমে—এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বর্তমানে জঙ্গল উজাড় হওয়ায় এবং খাদ্য হিসেবে বড় ইঁদুর ও পাখির সহজলভ্যতা কমে আসায় বনবিড়ালের আবাসস্থল হুমকির মুখে। অনেকে বনবিড়াল দেখলে দলবদ্ধভাবে ধাওয়া করে মেরে ফেলেন, যা এই প্রাণীর সংখ্যা হ্রাসের একটি বড় কারণ। অথচ বনবিড়াল মানুষের ওপর আক্রমণ করার কোনো নজির নেই; বরং এটি গাছে চড়তে ও সাঁতার কাটতে দক্ষ একটি শান্ত স্বভাবের স্তন্যপায়ী প্রাণী। অতিপ্রাকৃত কিছু নয়, বরং চারপাশের নিস্তব্ধতাই জায়গাটিকে অন্য রকম করে তুলেছে। অনেক অঞ্চলে বনবিড়ালের ডাককে কুডাক বলে মনে করা হয়। কারও ধারণা, বনবিড়াল ডাকলে অমঙ্গল ঘটে। বনবিড়ালের প্রধান খাদ্যের মধ্যে রয়েছে বড় ইঁদুর, পাখিসহ নানা ধরনের প্রাণী। জঙ্গল কমে যাওয়ায় আবাসস্থলের সংকট তৈরি হয়েছে।

বৈজ্ঞানিকভাবে ‘ফেলিস চাউস’ (Felis chaus) নামে পরিচিত এই জঙ্গল ক্যাট বা বনবিড়ালের গায়ের রং ধূসর-বাদামি এবং এর লেজ ও পায়ে ডোরাকাটা দাগ থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে বন্যপ্রাণীর ছবি তোলা রেজাউল হাফিজ রাহী সেদিনই প্রথমবারের মতো বনবিড়ালের ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছেন, যা প্রমাণ করে প্রকৃতিতে প্রাণীটি এখন কতটা দুর্লভ। আমরা যে জঙ্গলে সেদিন প্রাণীটিকে দেখলাম, তার অস্তিত্বও ভবিষ্যতে অনিশ্চিত। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বনবিড়ালকে প্রকৃতিতে বাঁচিয়ে রাখতে তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণে আমাদের সবাইকে এখন আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। দেখলাম, বড়সড় একটি বিড়াল হেঁটে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে গ্রাম থেকে জঙ্গল হারিয়ে যাচ্ছে। লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

সর্বশেষ - আন্তর্জাতিক

সর্বোচ্চ পঠিত - আন্তর্জাতিক