অ্যাডলফ হিটলারের মৃত্যুর ৮১ বছর পর জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল ‘আলটারনেটিফে ফ্যুর ডয়েচল্যান্ড’ বা এএফডি-র বিজয় নতুন করে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে দলটি ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে পার্লামেন্টে বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। স্যাক্সনি-আনহাল্ট জার্মানির ১৬টি রাজ্যের মধ্যে ভৌগোলিক আয়তনে অষ্টম ও জনসংখ্যার দিক থেকে ১১তম রাজ্য।
দলটির প্রধান প্রার্থী এবং পার্লামেন্টের সদস্য উলরিশ সিগমুন্ড এই জয়কে ঐতিহাসিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিজয়ী মঞ্চের পেছনে ‘আলেস ইস্ট ম্যোগলিখ’ বা ‘সবকিছুই সম্ভব’ স্লোগানটি যেন দুই মহাযুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়ানো ইউরোপের বুকে হিটলারের ছায়া ফিরিয়ে এনেছে। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এএফডি অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের কারণে ক্রমশ ভোটারদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে চলেছে।
রাজনৈতিক পটভূমি ও উদ্বেগসমূহ
- নাৎসি পার্টির ইতিহাস: ১৯১৯ সালে জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি হিসেবে দলটি গড়ে উঠেছিল। ১৯২১ সালে হিটলার নেতৃত্ব দখলের পর ১৯২৩ সালে বাভারিয়ায় ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটান এবং পরে কারাবাস করেন। ১৯৩৩ সালে তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে এবং ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত একদলীয় শাসন চালায়।
- ন্যাটোর প্রেক্ষাপট: ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের পর ইউরোপে পুনরায় উগ্র জাতীয়তাবাদ রোধে ন্যাটো সামরিক জোট গঠন করা হয়েছিল, যার অন্যতম লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও শান্তি রক্ষা করা।
- ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া: ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ এবং জেরুসালেম পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এএফডি-র এই জয়ে জার্মানির ইহুদিরা আতঙ্কিত। বিশেষ করে পশু জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির দাবি ধর্মীয় আচারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
- অভিবাসন ও নীতি: টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এএফডি-র ২৫৮ পৃষ্ঠার দীর্ঘমেয়াদী এজেন্ডায় অনিবন্ধিত অভিবাসীদের বহিষ্কার এবং ইতিহাস শিক্ষায় হিটলারের চেয়ে বিসমার্ককে গুরুত্ব দেওয়ার মতো বিতর্কিত পরিকল্পনা রয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যমতে, জার্মানির ছোট এই রাজ্যের নির্বাচন কেবল স্থানীয় বিষয় নয়, এর কম্পন লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিট পর্যন্ত অনুভূত হচ্ছে। বিবিসির ভিডিও প্রতিবেদনে এএফডি-র সমাবেশে সমর্থকদের চরমপন্থী প্রতীকী টি-শার্ট পরার চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এএফডি-র অর্থনৈতিক দাওয়াইয়ের মধ্যে রাশিয়া থেকে কম মূল্যে জ্বালানি আমদানি ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জার্মানির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আরমিন ফাউলচেনবর্গ এএফডি-কে ‘চরম উগ্র ডানপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি মনে করেন, আধুনিক গণতন্ত্রের মৌলিক স্তম্ভসমূহ, মানবাধিকার এবং বহুত্ববাদের প্রতি দলটি সরাসরি হুমকি। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দারাও হিটলারি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির ভয়ে উদ্বিগ্ন।
ব্রিটানিকার সংজ্ঞা অনুযায়ী, নাৎসিবাদ হলো যুক্তি, উদারতা ও আইনের শাসনের বিরোধী একটি উগ্র মতাদর্শ। আর্য শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভে বিশ্বাসী এই মতবাদটি বর্তমানে ইউরোপের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে এই দলটির উত্থান জার্মানির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নসহ অন্য দলগুলো তাদের মোকাবিলায় কৌশল নির্ধারণে হিমশিম খাচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জার্মানির ১৬ রাজ্যের মধ্যে ভৌগোলিকভাবে অষ্টম বৃহত্তম ও জনসংখ্যার দিক থেকে ১১তম রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্ট। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেই রাজ্যের নির্বাচনে কট্টর জাতীয়তাবাদীদের বিজয় উল্লাসে যেন কেঁপে উঠেছে পুরো ইউরোপ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এএফডির এমন বিজয়ে দুই মহাযুদ্ধের ক্ষেত্রভূমি শিল্পোন্নত এই মহাদেশটি যেন দেখতে পাচ্ছে ‘হিটলারের ছায়া’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ কথা সবাই জানেন যে, ১৯৩৩ সালে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি পার্টি হিসেবে বহুল পরিচিত ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জার্মানির রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জার্মান ‘জাত্যভিমান’ জাগিয়ে তোলা দলটি ১৯৪৫ পর্যন্ত সেখানে একদলীয় শাসন চালিয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শুধু তাই নয়, একের পর এক প্রতিবেশী দেশগুলোয় চালিয়েছিল আগ্রাসন।















