রাজধানীর মতিঝিলের ৮১ নম্বর ঠিকানায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘বাংলার বাণী’ ভবনটি বর্তমানে দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ৫৩ বছরের পুরনো এই চারতলা ভবনটি এক সময় উর্দু পত্রিকা ‘পাসবান’-এর কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এটি শেখ ফজলুল হক মণির নিয়ন্ত্রণে আসে এবং পরবর্তীতে এখান থেকে প্রভাবশালী দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ প্রকাশিত হতো। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট শেখ ফজলুল হক মণি নিহত হওয়ার পর ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘ সময় নানা রাজনৈতিক নাটকীয়তা চলে। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে শেখ মণির ছেলে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ভবনটির দখল বুঝে পান এবং সেখানে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয় ও ল’ চেম্বার স্থাপন করেন। ২০০৯ সালের ২১শে অক্টোবর ভবনটির নিচে বোমা হামলার ঘটনাও ঘটেছিল, যা ছিল মূলত তাপসকে লক্ষ্য করে চালানো হামলা বলে সে সময় দাবি করা হয়। মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচে ব্যস্ত সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে বহু ইতিহাসের সাক্ষী চারতলা ভবনটি। ৫৩ বছরের পুরাতন এই ভবনটির দেয়ালে লেপ্টে আছে বহু ইতিহাস।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কয়েক দিন আগেই শেখ ফজলে নূর তাপস দেশ ছাড়েন। তার অনুপস্থিতির সুযোগে ভবনটি দখলের জন্য কয়েক দফা চেষ্টা চালানো হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ৫ই আগস্টের পর বিক্ষুব্ধ জনতা ভবনটিতে হামলা চালায়। এরপর সমন্বয়ক পরিচয়ধারী কিছু ব্যক্তি ভবনটি ‘ফ্যাসিবাদের প্রতীক’ দাবি করে দখলমুক্ত করার ঘোষণা দিলেও সফল হতে পারেনি। পরে বিএনপি’র কিছু নেতাকর্মীও দখলের চেষ্টা চালিয়ে সরে দাঁড়ান। বর্তমানে ভবনের বেশিরভাগ অংশই প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের অনুসারীদের কব্জায় রয়েছে। গত কয়েকদিন অনুসন্ধান চালিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভবন সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এমন তথ্যই মিলেছে।
স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্যমতে, নুরুল হক নুরের আত্মীয় পরিচয়দানকারী সারোয়ার হোসেন সানী এবং বিএনপি’র অঙ্গসংগঠনের সাথে জড়িত সুমন নামের এক ব্যক্তি ভবনটির বর্তমান নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন। গণঅধিকার পরিষদের ব্যানারে পরিচালিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও নতুন গড়ে ওঠা রেস্টুরেন্টের মালিকানায় দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ভবনের পেছনের অংশে ‘পানসি’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট উদ্বোধন করা হয়েছে এবং সেখানে আরও রেস্টুরেন্ট খোলার প্রক্রিয়া চলছে। ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় সাবেক মেয়র তাপসের যে কার্যালয় ছিল, সেগুলোর দরজায় তালা ঝুলিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছেন প্রতিমন্ত্রী নুরের অনুসারীরা।
ভবনটিতে দীর্ঘ দিন ধরে ভাড়ার ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রিমিয়ার ব্যাংকের একটি শাখা। ব্যাংকটির সূত্র জানায়, ২০০২ সালে মালিকের সাথে চুক্তি অনুযায়ী তারা এই ভবনে ভাড়াটিয়া হিসেবে আছেন। গণ-অভ্যুত্থানের পর কিছু লোক ব্যাংকের কার্যালয়ে ঢুকে আসবাবপত্র ও নথিপত্র লুটপাটের চেষ্টা করে। বিভিন্ন সময় সমন্বয়ক পরিচয়ধারী ও প্রতিমন্ত্রী নুরের লোক পরিচয় দিয়ে আসা ব্যক্তিরা ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ভাড়া টাকা তাদের কাছে জমা দেওয়ার জন্য চাপ ও হুমকি দেয়। তবে বৈধ কাগজপত্র না থাকা এবং প্রকৃত মালিকের সাথে চুক্তি বলবৎ থাকায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে ভাড়া প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ৫ই আগস্টের পর ব্যাংকটির শাখাতেও লুটপাটের চেষ্টা হয়েছিল, যা কর্মীদের প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়। শুধুমাত্র একটি বেসরকারি ব্যাংকের কার্যক্রমে ব্যবহার হওয়া অংশ তারা দখলে নিতে পারেনি। রেস্টুরেন্টের পাশে, একই ভবনে ছোট পরিসরে করা পান, সিগারেট, ডাবসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রেতা ‘ওহ চিটাগাং’ নামের প্রতিষ্ঠানের মালিক মামুন বাবু বলেন, আমি ৬ হাজার টাকা ভাড়ায় সুমনের কাছ থেকে দোকানটি ভাড়া নিয়েছি।
ভবনটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিরাই এখন এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি নিয়ন্ত্রণ করছেন। বিষয়টি নিয়ে মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুজ্জামান তালুকদার জানান, ভবন দখলের বিষয়ে থানায় কোনো ধরনের অভিযোগ জমা পড়েনি এবং বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই ভবনটির বর্তমান দখলদারিত্ব এবং এর পেছনে থাকা ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে মতিঝিল এলাকায় বেশ আলোচনা চলছে।
















