বাংলাদেশ ২০১২ সালের জনসংখ্যা নীতিতে দুটি বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। প্রথমত, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ব্যবহার ৭২ শতাংশে উন্নীত করা এবং দ্বিতীয়ত, মোট প্রজনন হার (টিএফআর) প্রতি নারীপ্রতি ২ দশমিক ১-এ নামিয়ে আনা। দীর্ঘ ১৩ বছর পার হলেও এই দুটি লক্ষ্যের একটিও অর্জিত হয়নি। বরং জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে এবং প্রজনন হার কমানোর লক্ষ্যমাত্রা থেকে দেশ আরও পিছিয়ে পড়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও ২০১৯ সালে ব্যবহার হার সর্বোচ্চ ৬২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছিল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ২০১২-১৩ সালে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ব্যবহার হার ছিল ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ৮ শতাংশে। একই সময়ে মোট প্রজনন হার ২ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৪-এ উন্নীত হয়েছে। অথচ ১৯৭৫ সালে এই হার ছিল ৬ দশমিক ৩, যা পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির সফলতায় ২০১২ সালে ২ দশমিক ৩-এ নেমে এসেছিল। অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশের ৩ ধাপের পরিকল্পনা। ৩ মাসেই শেষ চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ-এলএনজি ভর্তুকির ৪৫ শতাংশ। ফ্রান্সের ক্যাম্পে হেয়ারড্রেসার নিষিদ্ধ, খেলোয়াড়দের আগমনেও জিদানের কড়াকড়ি। পরিবার পরিকল্পনায় কয়েক দশকের অগ্রগতির পর জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ব্যবহার কমার এই চিত্র সামনে এল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মাইনুল ইসলামের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে সঠিক পথে নেই। গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে এই কর্মসূচিতে মনোযোগের অভাবে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লাভের সুবিধা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ব্যবহার হ্রাসের পাশাপাশি বাল্যবিবাহ ও কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের উচ্চ হার পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। ইংরেজিতে একে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়।
করোনা মহামারির পর থেকে বিনা মূল্যে সামগ্রী সরবরাহ কমে যাওয়ায় কর্মসূচিতে গতি হারিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুনে ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি’ শেষ হওয়ার পর সংকট প্রকট হয়। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের (ডিজিএফপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে যে হারে সামগ্রী সরবরাহ করা হতো, ২০২৪ সালের জুনে তা অর্ধেকের নিচে নেমে আসে। হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু, পাবে ৩৪ লাখ শিশু। মূলত ওই কর্মসূচির আওতায় এসব সামগ্রী কেনা হতো।
২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকার আগের কর্মসূচি বাতিল করে নতুন প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে প্রকল্পটির অর্থ ছাড় পেতে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময় সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত অচল ছিল। অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি নাগাদ কনডম ও খাওয়ার বড়ি সরবরাহ ছিল নামমাত্র, যা মাঠপর্যায়ের সেবা কার্যক্রমকে অচল করে দেয়।
অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জিন্নাত রেহানা জানিয়েছেন, সরবরাহ সংকট কাটাতে নতুন প্রকল্পে ২১টি প্যাকেজের মধ্যে ৮টির চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ১৮ মাস যাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় থাকে, সেই লক্ষ্যেই কাজ চলছে। নভেম্বর বা ডিসেম্বরের মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে সামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জনবল ঘাটতিও এই খাতের অন্যতম বড় সংকট। ডিজিএফপির অনুমোদিত ৫৩ হাজার ৩৯০টি পদের মধ্যে বর্তমানে ১৯ হাজার ৮১৮টি বা ৩৭ শতাংশ পদ খালি। মাঠকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা ও পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছেন। মহাপরিচালক জানিয়েছেন, নিয়োগবিধি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে এবং পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা নিয়োগের বিষয়টিও সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
অধ্যাপক মাইনুল ইসলাম মনে করেন, এখন কেবল সামগ্রীর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়, সেবার মান ও সহজলভ্য দামের দিকেও নজর দিতে হবে। তিনি জানান, সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে মানুষ যেন নিজেদের পছন্দমতো পদ্ধতি বেছে নিতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় বাল্যবিবাহ ও অপরিকল্পিত গর্ভধারণ রোধ করা কঠিন হবে।
উল্লেখ্য যে, যখন কোনো দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা নির্ভরশীল মানুষের চেয়ে বেশি থাকে, তখনই দেশ জনমিতিক লাভের সুযোগ পায়। বাংলাদেশ এখনো আগামী এক দশকে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, তবে তার জন্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।
















