কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য থামছেই না। পুরোনো অপরাধীদের জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও সংশ্লিষ্ট দলবদ্ধ অপরাধের ৩২টি ঘটনা ও অভিযানের তথ্য পর্যালোচনা করলে একই দলের নাম বারবার উঠে আসছে। ২০২৩ সালের ৭ মার্চ থেকে চলতি বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব ঘটনায় মোট ৮৮১ জনকে আটক ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কয়েকজনের পূর্বাপর তৎপরতা বুঝতে এর আগের তথ্যও পর্যালোচনা করা হয়েছে। ঘটনায় নয়ন, চয়ন ও তাঁদের সহযোগীদের নাম আসে।
সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার মর্মান্তিক মৃত্যু ও গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা
চট্টগ্রামে প্রশিক্ষণ শেষে ২৪ এপ্রিল রাতে কুমিল্লায় ফিরছিলেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। পথে তিনি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন। পরদিন সকালে কোটবাড়ির আইরিশ হিল হোটেলসংলগ্ন মহাসড়কের পাশ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই হত্যায় অভিযুক্ত একজনকে প্রায় দুই মাস আগেও রেললাইন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, কিন্তু পরে সে জামিনে মুক্তি পায়। র্যাবের পরিবর্তে গঠিত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) সূত্র বলছে, ওই ব্যক্তি যে ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য, সেটি মূলত এলাকায় একটি কিশোর গ্যাং হিসেবেই পরিচিত। বুলেটের মা নীলিমা বৈরাগী সদর দক্ষিণ মডেল থানায় মামলা করেন এবং র্যাব পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। এসআরবির মতে, এদের মধ্যে একজন আগেও অপরাধে জড়িত ছিল। কুমিল্লা নগরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতায় আলোচিত নয়ন হোসেন ওরফে নয়ন বন্ডের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে কোতোয়ালি ও সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাতটি মামলা ছিল।
পুরোনো অপরাধীদের নতুন মহড়া
২০২৫ সালের এপ্রিলে গ্রেপ্তার ‘রতন গ্রুপের’ প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতন বর্তমানে জামিনে আছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে তাকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে দিয়ে মহড়া দিতে দেখা গেছে। এছাড়া কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মহসিন আহমেদ দাবি করেছেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের অনুষ্ঠানে শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকার সময় তিনি অনুসারীদের নিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু স্থানীয়ভাবে তাকে গ্যাং লিডার হিসেবেই দেখা হয়। মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি মো. নাহিদুজ্জামান রানা জানান, তারা কিশোর গ্যাংবিরোধী আন্দোলন করছেন এবং ভিডিওর সত্যতা যাচাই করছেন। ২০২৫ সালের ৩ জুন টমছম ব্রিজ এলাকায় ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে রাকিবুল হাসান রিয়াদ, সোহাগ মোল্লা ও খায়রুল হাসানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই সময় বিসিক শিল্পনগরী থেকে অস্ত্র, ককটেল, মাদকসহ গ্রেপ্তার চারজন ছিলেন তাঁর অনুসারী। পুলিশ ঘটনার নেপথ্যে কিশোর গ্যাং ও মাদক ব্যবসাসংক্রান্ত বিরোধের কথা জানায়।
হত্যার নেপথ্যে আইফোন ও তুচ্ছ বিরোধ
১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে ১৩ বছরের স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে হত্যা করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, আইফোন ছিনিয়ে নিতেই অপ্রতিমকে সেখানে ডেকে নিয়ে হত্যা করে সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ অন্যরা। কুমিল্লায় অপ্রতিম, বুলেট, হৃদয়, বাঁধন ও সজীব ওরফে বাবু—এই পাঁচটি হত্যার ঘটনা মূলত কিশোর গ্যাংয়ের চরম নৃশংসতার বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর রাতে অশোকতলা রেলগেট এলাকায় সজীব হোসেন ওরফে বাবুকে বাসা থেকে ডেকে মারধর ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়, যার পেছনেও গ্যাং সদস্যদের নাম উঠে এসেছে। র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, চালক ও যাত্রীর ছদ্মবেশে সেখানে ছিলেন ছিনতাইকারীরা। তাঁকে আঘাত করে মুঠোফোন, টাকা ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার পর চলন্ত অটোরিকশা থেকে ফেলে দেওয়া হয়।
গ্যাং সংস্কৃতি ও সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের অংশগ্রহণ
কিশোর গ্যাংয়ে কেবল বস্তির বা দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরাই জড়ায় না, বরং সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। দেবীদ্বারের এক সরকারি কর্মকর্তার সন্তান গ্যাংয়ে জড়িয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে তাকে নিরাময় কেন্দ্রে পাঠাতে হয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, পারিবারিক নজরদারির অভাবে সমাজের উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া ধর্মসাগরপাড়ে স্ত্রীকে অশালীন মন্তব্যের প্রতিবাদ করায় এক পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা করার ঘটনা গ্যাং সদস্যদের বেপরোয়া মনোভাবেরই পরিচয় দেয়।
আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জ
কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমান জানান, কিশোর গ্যাং–সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট আইন নেই। তবে অপরাধের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ধারায় নিয়মিত মামলা হচ্ছে। পুলিশের দাবি, তারা যথাযথ এজাহার দিচ্ছে, কিন্তু জামিন দেওয়া আদালতের বিষয়। অন্যদিকে, সরকারি কৌঁসুলি কাইমুল হক মনে করেন, গ্যাংয়ের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা এবং নিয়মিত নজরদারি করা অত্যন্ত জরুরি। সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) কুমিল্লা শাখার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় বলেন, সঠিক পরিচর্যার অভাবে সন্তানের গ্যাংয়ে জড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে। পুলিশের তথ্যমতে, নামে ‘কিশোর’ গ্যাং হলেও অনেক সদস্যের বয়স ১৯ থেকে ৪৭ বছরের মধ্যে, যা প্রমাণ করে এটি একটি সংগঠিত অপরাধ চক্রে পরিণত হয়েছে।
চিহ্নিত ১২টি গ্যাং
পর্যালোচনায় ১২টি কিশোর গ্যাং দল ও উপদলের নাম পাওয়া গেছে। এগুলো হলো রতন বা র স্কোয়াড, ঈগল, সিবিকে, সিবিকে ডেঞ্জার জোন, সিবিকে জুনিয়র, সিবিকে স্পেশাল, কিং স্কোয়াড, রেড ৯৯৯, বিজিএম, ইত্যাদি। পুলিশ বলছে, বারবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে তারা আবারও নতুন গ্যাং গঠন বা পুরোনো দলে ফিরে আসছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
















