ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, মালিকানার কাঠামোয় স্বচ্ছতা আনা এবং আমানতকারীদের আমানত সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনটি প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এখন থেকে কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা সরাসরি অংশীদারিত্ব না থাকলে সেই কোম্পানি কোনো ব্যাংকে প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে কাউকে নিয়োগ দিতে পারবে না। ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা দূর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এই নতুন বিধান প্রবর্তন করেছে।
নতুন নির্দেশনার মূল শর্তসমূহ
- কোনো কোম্পানির মালিকানা বা যথাযথ অংশীদারিত্ব না থাকলে তারা কোনো ব্যাংকে প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগের আইনি যোগ্যতা হারাবে।
- ব্যাংকের শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে ওই কোম্পানির নিট সম্পদমূল্যের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো কোম্পানি তার নিজ সম্পদমূল্যের চেয়ে বেশি শেয়ার কোনো ব্যাংকে ধারণ করতে পারবে না।
- ব্যাংকের মনোনীত বা প্রতিনিধি পরিচালকদের ভূমিকা, তাদের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নতুন বিধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
- ব্যাংক মালিকানায় যেন কোনো ধরনের অযৌক্তিক বিনিয়োগ বা ঝুঁকি তৈরি না হয়, তা রোধ করতেই এই সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।
- প্রতিনিধি পরিচালকদের দায়িত্ব পালনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর নজরদারি বজায় রাখবে এবং তাদের কাজের দায়বদ্ধতা সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে।
কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক?
দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং খাতে পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতা ও অস্পষ্টতা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। বিশেষ করে অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর প্রকৃত মালিকানা বা আর্থিক সক্ষমতা যাচাই না করেই প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হতো, যা ব্যাংকের সামগ্রিক সুশাসনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এই নির্দেশনার ফলে ব্যাংকগুলোতে যারা পরিচালনা পর্ষদে থাকবেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা ও দায়বদ্ধতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে থাকবে। এটি মূলত শেয়ারবাজারে কারসাজি বা ব্যাংকের তহবিল তছরুপের পথ রুদ্ধ করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিট সম্পদমূল্যের চেয়ে বেশি শেয়ার ধারণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় বড় ধরনের ঝুঁকি বা মালিকানা কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতাও হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিচালকদের জবাবদিহি ও কার্যকারিতা
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোতে মনোনীত বা প্রতিনিধি পরিচালকদের ভূমিকা এখন থেকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ হতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানির মালিকানাধীন না হলে সেই কোম্পানি ব্যাংকের পর্ষদে প্রতিনিধি পাঠানোর নৈতিক বা আইনি অধিকার রাখে না। এটি ব্যাংকের প্রতিটি পর্ষদকে আরও বেশি পেশাদার করবে এবং অকারণে পর্ষদ সদস্যদের প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ কমিয়ে আনবে। বিশেষ করে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে, এটি তারই একটি ধারাবাহিকতা। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর মালিকানা কাঠামোয় স্বচ্ছতা ফিরে আসবে এবং ব্যাংক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও বৃদ্ধি পাবে।
ব্যাংক খাতের ওপর প্রভাব
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপ ব্যাংকিং খাতের কাঠামোকে ঢেলে সাজাতে সাহায্য করবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো কোম্পানি ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সুবিধার্থে প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগ দেয়, কিন্তু তাদের নিজস্ব কোনো বড় বিনিয়োগ বা মালিকানা থাকে না। নতুন এই বিধানে নিট সম্পদমূল্যের বিষয়টি যুক্ত করায় সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে গেল। ফলে ব্যাংকের পর্ষদ গঠিত হবে এখন সত্যিকার অর্থে বিনিয়োগকারী ও সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে। এই সংস্কার প্রক্রিয়া ব্যাংক খাতের বিদ্যমান অনিয়ম দূর করতে দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত ব্যবধানে এই বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করবে এবং কোনো প্রতিষ্ঠান এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটালে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
















