দেশের চা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকরা দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তাদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে চার দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের প্রধান দাবি হলো দৈনিক মজুরি বাড়িয়ে ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা। এছাড়া অন্য তিনটি দাবির মধ্যে রয়েছে ২০২৩ সালের বিতর্কিত গেজেট বাতিল করা, চা জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (বিটিডব্লিউইউ) নির্বাচন অবিলম্বে আয়োজন করা।
বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন মজুরি নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। ২০২৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী, চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৮৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে মাত্র ১৯৬ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ, দৈনিক মজুরি বেড়েছে মাত্র ৯ টাকা। আন্দোলনকারী শ্রমিকদের মতে, পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের শুধু খাদ্যচাহিদা মেটাতেই প্রতিদিন অন্তত ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা প্রয়োজন। তাই ৫০০ টাকা মজুরির দাবি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার ন্যূনতম লড়াই মাত্র।
মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। সাধারণত প্রতি দুই বছর অন্তর মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের আলোচনার মাধ্যমে মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হতো। ২০২২ সালে ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলনের পর শ্রমিকদের মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের একতরফা গেজেটে দরকষাকষির সুযোগ বন্ধ করে বছরে মাত্র ৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির বিধান রাখা হয়েছে, যা শ্রমিকদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।
শ্রমিকদের অভিযোগ, বাগান মালিকরা রেশন ছাড়া অন্যান্য কল্যাণমূলক সুবিধাকে মজুরির অংশ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২(৪৫) ধারা অনুযায়ী, বাসস্থান, চিকিৎসা বা পানি সরবরাহের মতো সুবিধাগুলোকে মজুরি হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই। এছাড়া চা বাগানের জমি সরকারি খাস জমি হিসেবে চিহ্নিত হলেও, আইনি অধিকার না থাকায় শ্রমিকরা তাদের বসতভিটা নিয়ে সবসময় অনিশ্চয়তায় থাকেন।
আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগও উঠেছে। ৫০০ টাকা মজুরি আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী গীতা রানী কানুকে একটি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা শ্রমিকদের মধ্যে ভীতি ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ২০১৮ সালের পর থেকে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন না হওয়ায় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সাধারণ শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে চা শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলক অনেক বেশি। শ্রীলঙ্কার চা বাগানের মালিকরা একজন শ্রমিককে দৈনিক প্রায় ৬৫০ টাকা এবং ভারতের কেরালার ব্যবসায়ীরা প্রায় ৭১০ টাকা মজুরি প্রদান করেন। অথচ বাংলাদেশের বাগান মালিকরা উৎপাদনশীলতা কম হওয়ার অজুহাতে ন্যায্য মজুরি দিতে অনীহা প্রকাশ করেন, যা শ্রমিকদের জীবনকে মধ্যযুগীয় ভূমিদাসের মতো করে তুলেছে।
চা শ্রমিকদের এই আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অতীতে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রাইস-ইনডেক্স বেইজড মজুরি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তৎকালীন বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবির ও খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চা শ্রমিকদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছিলেন। শ্রমিকরা সেই প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রেখে ভোট দিলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার তাদের দাবি মেনে নেওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত শোচনীয়। দৈনিক হাজিরা নিশ্চিত করতে পাতা তোলা শ্রমিকদের ২৩ কেজি পাতা সংগ্রহ করতে হয়, গাছ ছাঁটাইয়ের শ্রমিকদের ২৫০টি গাছ ছাঁটতে হয় এবং কীটনাশক ছিটানো শ্রমিকদের এক একর জমিতে কাজ করতে হয়। এই হাড়ভাঙা খাটুনির পর যে সামান্য মজুরি তারা পান, তা দিয়ে পুষ্টিকর খাবার কেনা তো দূরের কথা, সাধারণ জীবনযাপনও অসম্ভব।
চা বাগানের মালিকরা সরকারি জমি ইজারা নিয়ে এবং ভর্তুকি মূল্যে সার ও অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ করেও শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করছেন। উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বিনিয়োগ না করে দায়ভার শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
পরিশেষে, চা শ্রমিকদের চার দফা দাবি মেনে নেওয়া এবং গ্রেপ্তারকৃত নেত্রী গীতা রানী কানুকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। সরকারের উচিত তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং চা শ্রমিকদের মানবিক জীবন নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ডেঙ্গু প্রতিরোধে তরুণ সমাজের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জ্বালানি ও সারের খরচের ধাক্কা যেভাবে সামলাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইউএস ওপেন / দাদির আত্মত্যাগ আর ২৩ বছরের হাহাকার: ইতিহাসের সামনে শেলটন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রিকসের বিবর্তন ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বর্তমান বাজারে পরিবার নিয়ে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য এই মজুরি বৃদ্ধি শ্রমিকদের কাছে নিষ্ঠুর তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর বাইরে শিক্ষা, চিকিৎসা, বস্ত্র, বাসস্থানসহ অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২২ সালে ৩০০ টাকা মজুরি নির্ধারণের আন্দোলনের পর শ্রমিকদের মজুরি ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১২০ টাকা থেকে ১৭০ টাকা করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর ফলে দৈনিক মাত্র ৮ থেকে ৯ টাকা করে মজুরি বাড়ে, যা একেবারেই অপ্রতুল।















