পৃথিবীর সেরা সৃষ্টি মানুষ। জগতের সমস্ত কিছুই মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। তবে প্রশ্ন জাগে, সব মানুষ কি প্রকৃতির সৌন্দর্য ও মানবতার এই অমোঘ বাণী হৃদয়ে ধারণ করে? প্রকৃত অর্থে, উত্তরটি নেতিবাচক। অধিকাংশ মানুষই স্বার্থপরতায় নিমজ্জিত। অথচ মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসা ও সহমর্মিতাই পৃথিবীতে শান্তি বজায় রাখার প্রধান ভিত্তি। কিন্তু সব মানুষ কি পৃথিবী ও প্রকৃতির সৌন্দর্যের কথা মনে রাখে। এককথায় বলতে গেলে না, সবাই সেটা করে না। কিছু মানুষই সেই গৌরবের কথা ভুলে গিয়ে অন্য মানুষের প্রতি অসৌজন্য প্রদর্শন করে।
গরিব ও অসহায় মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও তাদের প্রকৃত অবস্থা জানার উপায় সম্পর্কে একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে: ‘To able to love the poor and know the poor we must be poor ourselves’—অর্থাৎ, দুঃখী মানুষদের ভালোবাসতে এবং তাদের বুঝতে হলে আমাদের নিজেদেরও সেই অভাবের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। অন্যের কষ্টে সমব্যথী হওয়া ছাড়া মানবতার প্রকৃত সংজ্ঞা পাওয়া অসম্ভব। পৃথিবীতে বেশির ভাগ মানুষের প্রতি নির্মম ও পাশবিক আচরণের যেসব চিত্র দেখা যায়, তাতে গা শিউরে ওঠে এবং এতে বিমর্ষ না হয়ে উপায় নেই। নিজ স্বার্থ ও ক্ষমতার মোহে মানুষের প্রতি নির্যাতন-নিপীড়ন ও নৃশংসতার যে করুণ চিত্র পৃথিবীতে বিরাজমান, তা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী।
কামিনী রায় তার বিখ্যাত কবিতার ছত্রে মানুষের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’ এই উক্তিই প্রমাণ করে যে, মানুষের জীবনের মূল সার্থকতা পরোপকারের মধ্যেই নিহিত। এটি কেবল নৈতিক শিক্ষা নয়, বরং প্রকৃতির দাবি ও মানবতার বড় চাহিদা।
আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ভালোবাসার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ এবং আল্লাহর বিধান মানুষের সাফল্যের চূড়ান্ত উৎস। মানুষ যখন একে অপরকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে শেখে, তখনই সে সাফল্যের পথে এগিয়ে যায়। মাওলানা রুমি সর্বজনীন প্রেমের বিষয়ে বলেছিলেন, ‘আমি মসজিদে যাই, মন্দিরে যাই, গির্জায় যাই—যেখানে প্রেম আছে, সেখানেই আমার প্রার্থনা।’ একইভাবে তার শিক্ষক শামস তাবরিজী প্রেমের প্রভাব সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে, যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে প্রেমের সন্ধান করে, সেই ব্যক্তিই ভেতরে ভেতরে পরিবর্তিত হয়ে যায়। মহান আল্লাহর চিরন্তন আহ্বানই হলো: ‘মানুষ এবং মানুষকে ভালোবাসার মাধ্যমেই জীবনকে সার্থক করো।
ভালোবাসার গভীরতা নিয়ে আধুনিক ইংরেজ কবি জন ওয়াইন বলেছিলেন, ‘এন্ড হোয়ার ইউ লাভ ইউ ক্যান্ট ব্রেক ওয়ে।’ অর্থাৎ, যেখানে প্রকৃত ভালোবাসা থাকে, সেখান থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। এই অকৃত্রিম টানই মানুষকে মানুষ হিসেবে পূর্ণতা দেয়। প্রকৃতির এই অমোঘ নিয়ম এবং মানবতার দাবি রক্ষা করা প্রতিটি মানুষের কর্তব্য। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অর্থ কেবল নিজের স্বার্থসিদ্ধি নয়, বরং অন্যের হৃদয়ে ভালোবাসার জায়গা করে নেওয়া। মানুষকে তার নাগরিক অধিকার এবং মনুষ্যত্ববোধের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।
















