জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য পাঠ্যবইয়ে ব্যাপক পরিমার্জন ও পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। এবারের পাঠ্যবইগুলোতে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনার বর্ণনায় নতুন তথ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করা হচ্ছে। প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি নতুন বই ছাপার কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।
সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও গণ-আন্দোলন’ অধ্যায়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনা নতুন করে সাজানো হচ্ছে। নতুন পাঠ্যবইয়ের বয়ান অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গণহত্যা চালায়। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আক্রমণের পর তারবার্তার মাধ্যমে সারা দেশে সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এমতাবস্থায়, অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমান ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যার খবর পেয়ে ‘উই রিভল্ট’ বা ‘আমি বিদ্রোহ করলাম’ ঘোষণা দিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করেন। এরপর ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে তিনি ব্যাটালিয়নের বাঙালি সদস্যদের নিয়ে যুদ্ধের ডাক দেন। পরে ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও লিবারেশন আর্মির সর্বাধিনায়ক হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষেও স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। এই ঘোষণাই মুক্তিপাগল বাঙালিকে যুদ্ধে উজ্জীবিত করে, যা শেষ পর্যন্ত ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবং ৩০ লাখ শহীদের বিনিময়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। ইতিমধ্যে বেশ কিছুসংখ্যক বই ছাপাও হয়েছে। একপর্যায়ে স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের সূচনা এবং ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের কথা বলা হয়েছে। দেশের মানুষ নেতৃত্বশূন্যতায় দিশেহারা ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। তারপর রাত ২টা ১৫ (২৬শে মার্চ) মিনিটে ব্যাটালিয়নের সব বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের একত্র করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর জনযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে পাকিস্তানিদের ২৪ বছরের শোষণ আর বৈষম্যের অবসান ঘটে।
উল্লেখ্য যে, এই বর্ণনার সাথে পূর্ববর্তী সরকারের আমলের বইয়ের বর্ণনার পার্থক্য রয়েছে। ২০২৩ বা ২০২২ সালের পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাকে প্রধান্য দিয়ে সেটিকে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হতো। আবার চলতি বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রণীত বইয়েও কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে বর্ণনা পাওয়া যায়। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সাথে সাথে পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের এই বর্ণনার এমন পালাবদল নতুন কিছু নয়।
ইতিহাসের বর্ণনার পাশাপাশি আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তকে নতুন আরও কিছু বিষয় যুক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্সের বর্ণনা, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলি এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা। এছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি নিবন্ধও পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
পাঠ্যক্রমের এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বাংলা এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়েও নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত হয়েছে। নতুন শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ শ্রেণিতে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’ নামে দুটি এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’ নামে আরও দুটি নতুন বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
এই ধরনের ঘন ঘন ইতিহাস পরিবর্তনের বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধের গবেষক আফসান চৌধুরী মনে করেন, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যেই প্রতিটি সরকার ক্ষমতার পালাবদলের সাথে পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস পরিবর্তন করে থাকে। তিনি আরও বলেন, কেবল রাজনৈতিক ইতিহাসের ওপর ভিত্তি না করে বরং সমাজ ও অপ্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের চর্চাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, যা শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হতে পারে। যদিও সরকারি পরিকল্পনানুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে এই নতুন পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করে।














