দীর্ঘ ১৬ বছরের হিসেব বদলে দিয়ে ভারতকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভৌগোলিক নৈকট্য ও স্থলপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধার কারণে এতদিন ভারত এই অবস্থানে ছিল। তবে সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ভারত এখন তালিকার তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৬৭ কোটি ডলার। একই সময়ে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭২ কোটি ডলার। অর্থাৎ, ভারতের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের ১৯৫ কোটি ডলারের বেশি বাণিজ্য হয়েছে।
বাণিজ্যিক এই পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি বৃদ্ধি। গত অর্থবছরে দেশটি থেকে বাংলাদেশের আমদানি বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে নেতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা গেছে; সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি ৩ শতাংশ এবং আমদানি প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ কমেছে। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জেরে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ এই পতনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ার কারণেই দেশটিতে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়েছে। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য কমার বিষয়ে তিনি বলেন, দুই দেশের আরোপ করা অশুল্ক বাধা উভয় পক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ভোক্তা ও উৎপাদকদের ওপর।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য পরিস্থিতি এখনো অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক উপরে। গত অর্থবছরে চীনের সঙ্গে মোট ২ হাজার ২৯৬ কোটি ডলারের পণ্য বাণিজ্য হয়েছে, যা মোট পণ্য বাণিজ্যের ১৯ শতাংশ। এর মধ্যে চীন থেকে আমদানি বেড়েছে ৭ শতাংশ এবং রপ্তানি বেড়েছে ১১ শতাংশ। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১১ শতাংশ এবং ভারতের সঙ্গে ৯ শতাংশ বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে এই তিন দেশ মিলে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের ৩৯ শতাংশ দখল করে রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ার পেছনে বড় কারণ ছিল দুই দেশের মধ্যকার পাল্টা শুল্ক নিয়ে দর-কষাকষি। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক আরোপের পর আলোচনার মাধ্যমে ৯ ফেব্রুয়ারি একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে শুল্ক ১৯ শতাংশে নামানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশ। চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাকে শূন্য শুল্ক সুবিধার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি।
আমদানি বাড়ার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের মান ভালো এবং সরবরাহের নিশ্চয়তা বেশি। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ ও সীকম গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো জানিয়েছে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অন্য দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে ঝুঁকি বাড়ায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের দিকে বেশি ঝুঁকেছেন। গত অর্থবছরে সরকারি পর্যায়ে গম ও এলএনজি এবং বেসরকারি পর্যায়ে সয়াবিনবীজ ও তুলা আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এনবিআরের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি হয়েছে ২২ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের এবং সয়াবিনবীজ আমদানি ৩৫ কোটি থেকে বেড়ে ৬২ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে, ভারত থেকে আমদানিতে কড়াকড়ি ও বিভিন্ন বিধিনিষেধ বাণিজ্য কমিয়ে দিয়েছে। মার্চ ২০২৫ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত এবং পরে কলকাতার বিমানবন্দর ব্যবহারের সুবিধা প্রত্যাহার করার প্রভাব পড়েছে বাণিজ্যে। এছাড়া ভারত সরকারও পোশাক, খাদ্যপণ্য ও প্লাস্টিক পণ্যের ওপর বিভিন্ন শর্ত আরোপ করেছে। এর ফলে ভারতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ১২ শতাংশ কমে ৫৭ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ আমদানি বাড়িয়েছে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের জন্য ইতিবাচক শুল্ক সুবিধা পেতে সাহায্য করতে পারে। বর্তমানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাকে বিশেষ শুল্কছাড় পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছেন। তবে ভারতের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে উভয় দেশের ব্যবসায়ীরাই দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই পরিবর্তন কেবল আমদানি-রপ্তানির অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের ভূরাজনৈতিক বিষয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শূন্য শুল্কসুবিধা না থাকলে রপ্তানি আরও কমত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ৬২৬ কোটি ডলার। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরের অর্থবছরে দেশটি থেকে আমদানি বাড়ায় উদ্বৃত্ত কমে ৫৫৫ কোটি ডলারে নেমেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৯১১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিপরীতে দেশটি থেকে আমদানি করেছে ৩৫৬ কোটি ডলারের পণ্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কয়েক দফা আলোচনার পর শুল্কহার ২০ শতাংশ নির্ধারিত হয় এবং ৭ আগস্ট তা কার্যকর হয়।
















