ছোটবেলায় ক্যালিফোর্নিয়ার এক ছোট শহরে বেড়ে ওঠা রোজিনা আলীর কাছে আমেরিকা ছিল স্বপ্নের দেশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই রাষ্ট্র ধর্মীয় স্বাধীনতা, বহুত্ববাদ ও সহনশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর যখন তার বাবা-মা তাকে ও ভাইবোনদের সতর্ক করে বলেছিলেন যে, এখন থেকে মুসলিমদের সন্দেহের চোখে দেখা হতে পারে, তখন রোজিনা তা বিশ্বাস করতে পারেননি। তিনি বারবার বাবা-মাকে বলতেন, ‘এটা আমেরিকা, পাকিস্তান নয়।’ তবে সময়ের পরিক্রমায় সাংবাদিকতা করতে গিয়ে রোজিনা বুঝতে পারেন, তার বাবা-মায়ের আশঙ্কা অমূলক ছিল না। বরং ৯/১১-এর পর মুসলিমদের জীবনে যে ভয় ও নজরদারি নেমে এসেছিল, তার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।
রোজিনা আলী তার নতুন বই ‘সিজনস অব ফিউরি’-তে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষের বিবর্তন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে এর সংযোগ নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান করেছেন। গার্ডিয়ানের পডকাস্ট ‘স্টেটসাইড উইথ কাই অ্যান্ড কার্টার’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ৯/১১-এর পর মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন এক আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল যে, অনেকের মনে হতো ‘দেয়ালেরও কান আছে’। এফবিআই, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা, ক্যাফে এমনকি মসজিদেও নজরদারি চালাত। অনেক ক্ষেত্রে গোপন তথ্যদাতা ব্যবহার করা হতো, আবার অনেককে এমন কর্মকাণ্ডে প্ররোচিত করা হতো, যা পরবর্তীতে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হতো।
রোজিনার গবেষণায় উঠে এসেছে, মুসলিমদের ঘিরে এই সন্দেহের ইতিহাস ৯/১১ দিয়ে শুরু হয়নি। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে আরব-আমেরিকানদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এরপর ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিক হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ধীরে ধীরে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে মুসলিমদের একটি সরল যোগসূত্র তৈরির প্রবণতা দেখা দেয়। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইসলামপন্থী সন্ত্রাসবাদকে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখা শুরু হয়। ১৯৯৫ সালের ওকলাহোমা সিটি বোমা হামলার পর অনেকেই মুসলিমদের সন্দেহ করেছিল, যদিও হামলাকারী ছিলেন শ্বেতাঙ্গ সাবেক সেনাসদস্য টিমোথি ম্যাকভেই।
রোজিনা উল্লেখ করেন, আরব-আমেরিকান আইনজীবী আবদিন জাবারার মতো ব্যক্তিদের বছরের পর বছর নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। ফিলিস্তিন ইস্যু, আরব পরিচয় ও মুসলিম পরিচয়কে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার প্রবণতা সেই সময় থেকেই শক্তিশালী হতে থাকে। রোজিনার মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজা যুদ্ধকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তিনি মনে করেন, ইসলামবিদ্বেষ এখন আর প্রান্তিক কোনো বিষয় নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির একটি বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিউইয়র্ক বা মিশিগানের মুসলিম রাজনীতিকদের ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কগুলো সেই পুরোনো সন্দেহেরই প্রতিধ্বনি।
রোজিনা আলী সতর্ক করেছেন যে, ৯/১১-এর পর মুসলিমদের লক্ষ্য করে যে নিরাপত্তা কাঠামো ও আইনগত ক্ষমতা তৈরি করা হয়েছিল, তা এখন অন্য জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে লাতিনো অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব স্পষ্ট। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর কোনো পরিষ্কার ও সীমিত সংজ্ঞা তৈরি করতে পারেনি, ফলে জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে নজরদারির পরিধি কেবল বাড়ছে। রোজিনার কাছে ৯/১১ কেবল একটি সন্ত্রাসী হামলার ইতিহাস নয়; এটি গত ২৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ভয়, সন্দেহ, ধর্মীয় পরিচয় এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের এক দীর্ঘ ও জটিল আখ্যান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ক্যালিফোর্নিয়ার ছোট শহরে বেড়ে ওঠা রোজিনা ইতিহাসের বই পড়তেন, ‘বাফি দ্য ভ্যাম্পায়ার স্লেয়ার’-এর ডিভিডি দেখতেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাঁচ বছর বয়সে পাকিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা রোজিনা ধীরে ধীরে নিজেকে এই দেশেরই একজন হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাদের মনে হয়েছিল, দেশ যুদ্ধের মধ্যে ঢুকে গেছে এবং হামলাকারীরা মুসলিম হওয়ায় আমেরিকার মুসলিম পরিবারগুলোকেও এখন সন্দেহের মুখে পড়তে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বইটিতে তিনি ৯/১১-এর আগের কয়েক দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং ধীরে ধীরে রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে, তা অনুসন্ধান করেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থাৎ কেউ অপরাধী কি না, সেটাই সবসময় মূল বিষয় ছিল না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়, শরণার্থীদের সহায়তায় অর্থ সংগ্রহ শুরু হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর ইসরায়েলি অলিম্পিক অ্যাথলেটদের জিম্মি করে হত্যা করার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আরব জনগোষ্ঠীর ওপর নজরদারি শুরু করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু পরে এর আওতা বাড়তে থাকে এবং আরব বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকরাও এর মধ্যে চলে আসেন।













