সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ভোররাতে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন রাজশাহী প্রেসক্লাবের সভাপতি ও প্রবীণ সাংবাদিক সাইদুর রহমান। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগসহ বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। গত রোববার গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোররাতে তাঁর মৃত্যু ঘটে। হাসপাতাল থেকে তাঁর মরদেহ নগরের দরগাপাড়ায় নিজ বাসার সামনে নিয়ে আসার পর শেষ শ্রদ্ধা ও জানাজার অপেক্ষায় পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীরা জড়ো হন। কয়েকজন সাংবাদিক চেষ্টা করছিলেন খাটিয়ার নিচে বরফ দেওয়া যায় কি না। তা ছাড়া আরও কিছু শারীরিক সমস্যা ছিল। রাজশাহী শহরের গুরুত্বপূর্ণ মানুষের ফোন নম্বর মুখস্থই রাখতেন।
সেদিন রাজশাহীর আবহাওয়া ছিল ভ্যাপসা গরম। জানাজা হওয়ার আগ পর্যন্ত মরদেহ সংরক্ষণের জন্য অ্যাম্বুলেন্সের সংকট দেখা দিলে প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন রাজশাহী জেলা প্রশাসকের সহায়তা চান। জেলা প্রশাসক তৎক্ষণাৎ একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দেওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। সাংবাদিকরা এ বিষয়ে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। সুবিধা করতে না পেরে তাঁরা কয়েকজন ছুটে গেলেন রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কাছে। সাংবাদিকেরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে চলে এলেন।
সাইদুর রহমান ছিলেন রাজশাহীর এক সম্ভ্রান্ত ও রাজনৈতিক সচেতন পরিবারের সন্তান। তাঁর নানা মাদার বখশ অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তাঁর বাবা আতাউর রহমান ছিলেন জেলা ন্যাপের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করলে আতাউর রহমানকে রাজশাহীর গভর্নর করা হয়েছিল। তাঁর মা বেগম মনোয়ারা রহমান ছিলেন একজন ভাষাসৈনিক।
মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে সাইদুর রহমান উচ্চশিক্ষার জন্য রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে এসে তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। আশির দশকে দৈনিক করতোয়ার মাধ্যমে তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে ভোরের কাগজের সাথে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ সময় রাজশাহী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং মৃত্যুর আগের কয়েক বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে বলা শুরু করতেন।
জীবনজুড়ে ছিলেন বাউন্ডুলে ও একনিষ্ঠ সাংবাদিক। আজীবন অবিবাহিত থাকা সাইদুর রহমানের প্রকৃত ঠিকানা হয়ে উঠেছিল রাজশাহী প্রেসক্লাব। কর্মজীবনের বেশির ভাগ সময় প্রেসক্লাব, আবাসিক হোটেল অথবা বন্ধুর ভাইয়ের বাসায় কাটিয়েছেন। তাঁর সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি নিয়ে অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত। তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে দেশের বাইরে থাকা কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালাহউদ্দিন সুমন স্মৃতিচারণ করে জানান, তিনি সাংবাদিকতার গুরু হিসেবে সাইদুর রহমানের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। ছাত্রাবাসে জায়গা না পেয়ে ছয় মাস তাঁর সঙ্গে প্রেসক্লাবেই কাটিয়েছেন।
সাংবাদিকদের পেশাগত উপস্থিতি বাড়াতে তিনি সবসময় সচেষ্ট থাকতেন এবং সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন সময় সুস্থ থাকার পরামর্শ বা রেসিপি বিনিময় করতেন। ইন্টারনেট যুগে সাংবাদিকদের আনাগোনা কমলেও তিনি প্রেসক্লাব ছাড়েননি। বিভিন্ন দিবসে প্রেসক্লাবের বাইরে মাইক লাগিয়ে কর্মসূচি পালন করতেন, যেন রাজশাহীতে প্রেসক্লাবের অস্তিত্ব জনসমক্ষে টিকে থাকে। শহরের জিরো পয়েন্টে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিবাদী মানববন্ধনের আয়োজনেও তিনি থাকতেন অগ্রভাগে। মনে আছে, একবার সংবাদ সম্মেলন শেষে আমাকেও সুস্থ থাকার একটি রেসিপি বলে দিয়েছিলেন।
সাইদুর রহমানের জানাজার আগে তাঁর শেষ ইচ্ছা ও সঞ্চয় সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। তাঁর বোন ও ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান স্কুলশিক্ষক আফরোজি রহমান খেলনা জানান, সাইদুর রহমান তাঁর জীবনের উপার্জিত সবটুকু সম্পদ জনকল্যাণে একটি ট্রাস্টের নামে লিখে দিয়ে গেছেন। তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের মধ্যে রয়েছে রাজশাহী শহরে থাকা ১০ কাঠা জমি, রাজশাহী-নওগাঁ রুটে চলাচলকারী একটি বাস এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা মোটা অঙ্কের মূলধন।
সাইদুর রহমানের মৃত্যুতে অনেকের আক্ষেপ, যে ব্যবসায়ী মহলে তাঁর বিনিয়োগ ছিল, তাঁদের কাউকেই অসুস্থ থাকা অবস্থায় বা মৃত্যুর পর দেখা যায়নি। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে অনেকের সঙ্গে তাঁর বিরোধ থাকলেও তিনি নিয়মিত জেলা প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা সভায় উপস্থিত থাকতেন এবং সভার বিষয়বস্তু সংবাদ আকারে সবার মেইলে পাঠিয়ে দিতেন। সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর এই দায়বদ্ধতা ছিল অটুট। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রাজশাহীর সাংবাদিকতায় একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।















