রংপুরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও নানা সংকটে শিল্প খাত কাঙ্ক্ষিত গতি হারিয়েছে। পাশাপাশি নার্সারি ও উদ্যানভিত্তিক ব্যবসারও প্রসার ঘটছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন, পরিবহন ও আর্থিক সেবা খাতের প্রসার ঘটছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হওয়ায় বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
এ অঞ্চলের ব্যবসা–বাণিজ্য ও শিল্পায়নের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এমদাদুল হক। তিনি জানান, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীরা চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলো র রংপুর প্রতিনিধি আলতাফ হোসেন। এ ক্ষেত্রে শতরঞ্জির কথা উল্লেখ করা যায়।
এমদাদুল হকের দেওয়া তথ্যমতে, রংপুরের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কৃষি ও কৃষিনির্ভর খাত। ধান, আলু, ভুট্টা, শাকসবজি ও তামাকের প্রক্রিয়াজাতকরণ এ অঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণ। এছাড়া নার্সারি, হস্তশিল্প, বিশেষ করে বিশ্বখ্যাত শতরঞ্জি এবং চাল, সার, কীটনাশক ও পাটের ব্যবসা স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। তবে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়ে গেছে। রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্তমান সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানান, বিদ্যমান নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ কারখানা বর্তমানে আংশিক সক্ষমতায় উৎপাদন পরিচালনা করছে। এর বাইরে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে। মূলত ঋণপ্রাপ্তিতে জটিলতা, উচ্চ সুদের হার এবং জ্বালানি সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, কঠিন শর্ত ও ঋণ বিতরণে জটিলতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে পারছেন না।
পুরানো শিল্পাঞ্চলগুলোর বেহাল দশা তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত রংপুর বিসিক শিল্পনগরে জায়গা সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। এছাড়াও ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থা, বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা এবং নিরাপত্তার ঘাটতি থাকায় উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে একটি দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন। তৃতীয়ত, ১৯৭৮–৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত রংপুর বিসিক শিল্পনগরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থা, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, নিরাপত্তার ঘাটতি এবং জায়গার সংকট রয়েছে।
রংপুরে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেশ কিছু অটো রাইস মিল, প্লাস্টিক ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়েছে। তবে লোকসান ও ব্যবসায়িক জটিলতায় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্পায়নের এই বাধা কাটাতে রংপুর চেম্বার কর্তৃপক্ষ আগামী ১০ বছরের জন্য কর অবকাশ এবং শিল্প, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে বিশেষ বরাদ্দের জোরালো দাবি জানিয়েছে।
রংপুর বিভাগে পরিকল্পিত চারটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত চালুর ওপর জোর দিয়ে এমদাদুল হক পরামর্শ দেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তত একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত প্রস্তুত করে বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও পরিষেবার নিশ্চয়তা পেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং খাদ্যশিল্প, হালকা প্রকৌশল ও প্লাস্টিক খাতে বড় বিনিয়োগ আসতে পারে।
বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও আশার আলো দেখাচ্ছেন নারী ও তরুণ উদ্যোক্তারা। তারা হস্তশিল্প, শতরঞ্জি, বুটিকস, ই-কমার্স, ক্যাটারিং ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো নতুন ধারার পেশায় নিজেদের যুক্ত করছেন। এসব উদ্যোগ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে সামগ্রিক শিল্পায়নের স্বার্থে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর বাস্তবায়ন এবং নীতিগত সহায়তাই এখন মূল দাবি বলে মনে করেন চেম্বার সভাপতি।















