সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দিকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর ছোড়া দুটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে দেশটির নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। একই সঙ্গে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শনাক্ত ও ধ্বংস করেছে বলে জানিয়েছেন জোটের মুখপাত্র। শহরটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিন্দা ও উদ্বেগ
সৌদি আরবে হুতিদের এই ক্রমবর্ধমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। নিরাপত্তা পরিষদের পর্যায়ক্রমিক সভাপতি ও জাতিসংঘে নিযুক্ত ফ্রান্সের দূত জেরোম বনফোঁ জানিয়েছেন, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা এসব হামলার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, হুতিদের এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ বহু বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। কেবল বেসামরিক মানুষই নয়, হুতিরা সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে। জুলাই মাসে নতুন করে সংঘাত শুরুর পর থেকেই ইয়েমেন পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে এবং এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাস থেকে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাতের ফলে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যার মধ্যে ৭০ হাজারই শিশু। জুলাইয়ে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত কয়েক বছর ধরে চলা যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেয়। এরপর ইয়েমেনকে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে। গত বৃহস্পতিবার রাতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া এক দীর্ঘ টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ও মিত্রদের সহায়তা
হুতিদের হামলা বেড়ে যাওয়ায় সৌদি আরব তার মিত্রদেশগুলোর কাছ থেকে সামরিক সহায়তা গ্রহণ করছে। ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় রিয়াদকে সহায়তার বিষয়ে আলোচনার জন্য সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সেনাপ্রধানেরা একটি জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। এই চুক্তির মূল শর্ত হলো, সদস্য দেশগুলোর কোনো একটির ওপর আক্রমণ হলে তা সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে। কৌশলগত এই আলোচনার জন্য তুরস্কের সেনাপ্রধান জেনারেল সেলসুক বায়রাকতারোগলু ইতিমধ্যে সৌদি আরব সফর করছেন। তবে চুক্তিটি তুরস্কের পার্লামেন্টে এখনো অনুমোদিত না হওয়ায় আঙ্কারার সহায়তা বর্তমানে কারিগরি ও দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে জানা গেছে। সেখানেই তিন দেশের সেনাপ্রধানেরা আলোচনায় বসার কথা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত আগস্টে স্বাক্ষরিত চুক্তির ভিত্তিতে ইতিমধ্যে নিউইয়র্কে বৈঠক করেছেন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।
তেল বন্দর ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
- গত বৃহস্পতিবার হুতিরা জানিয়েছে যে তারা সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
- সৌদি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে হুতিদের ছোড়া মোট ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা সফলভাবে আকাশেই ধ্বংস করেছে।
- এর আগে রিয়াদ, মক্কা, জেদ্দা এবং প্রধান তেল বন্দর ইয়ানবুসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।
- ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ জানিয়েছেন, লোহিত সাগর উপকূলে ইয়ানবু তেল বন্দর রক্ষায় ফ্রান্স সেনাসদস্য, রাডার ও আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠাচ্ছে।
- ফরাসি প্রেসিডেন্ট আরও উল্লেখ করেছেন, এই সামরিক উপস্থিতির উদ্দেশ্য কোনো সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো নয়, বরং বন্দরটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ইয়েমেনের হুতি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হেজাম আল-আসাদ দাবি করেছেন, তাদের সশস্ত্র বাহিনী এসব আক্রমণকে পূর্ণ মাত্রার উত্তেজনার প্রস্তুতি হিসেবে দেখছে না বরং একে ছোট পরিসরের মহড়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। হুতিরা লোহিত সাগরের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং ইয়েমেনের উপকূলীয় অঞ্চল দখল করে নৌ-অবরোধ আরোপ করার পাশাপাশি জ্বালানি ট্যাংকারে হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে উত্তেজনা বাড়িয়ে চলেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সৌদি আরবের শীর্ষ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ গ্র্যান্ড মুফতি হুতিদের নির্মূল না করা পর্যন্ত সেনাদের জীবন বাজি রেখে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। এদিকে হুতি বাহিনী ইয়েমেনি বাহিনীর বিরুদ্ধে যে স্থল অভিযান চালাচ্ছে, তাতে দেশটিতে নতুন করে মানবিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
















