ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের আবহে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর ও সংলগ্ন অঞ্চলে নিজেদের সামরিক আধিপত্য বিস্তারে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহের ঘটনাক্রমে, হুতিরা ইয়েমেনের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দরটি সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর হাত থেকে দখল করে নিয়েছে। বাব আল-মানদেব প্রণালি থেকে ৫০ মাইলেরও কম দূরত্বে অবস্থিত এই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ এখন হুতিদের হাতে, যা লোহিত সাগরের সামুদ্রিক যাতায়াত ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অস্থিরতায় হুতিরা বেশ কিছুদিন পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থাকলেও জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে তারা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। হুতিদের এই অগ্রযাত্রাকে কেবল স্থানীয় লড়াই হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং তেহরানের সঙ্গে তাদের কৌশলগত অক্ষ যে আরও শক্তিশালী হয়েছে, তা স্পষ্ট। হুতিদের এই সামরিক অভিযান সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানির জন্য নতুন হুমকি তৈরি করেছে। ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখায় লোহিত সাগরই ছিল সৌদি তেলশিল্পের প্রধান ভরসা। কিন্তু জুলাইয়ে হুতিদের নতুন আক্রমণের পর এই রুট দিয়ে সৌদি তেল রপ্তানি প্রায় ৯৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
হুতিদের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হতাশা কাজ করছে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর থেকে কার্যকর কোনো রাজনৈতিক সমাধান না আসায় এবং ১২ বছরের গৃহযুদ্ধের কোনো সুরাহা না হওয়ায় গোষ্ঠীটি হতাশ ছিল। ২০২৩ সালে জাতিসংঘের একটি খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া বেতন পরিশোধের বিনিময়ে হুতিদের তেল-গ্যাসের রাজস্ব পাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই পথে না হেঁটে হুতিরা গাজায় হামাসের প্রতি সংহতির নামে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোতে হামলা শুরু করে। এরপর ইসরায়েলি বাহিনীর পাল্টা হামলায় তাদের মূল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা দমে যায়নি, বরং নিজেদের সামরিক সরঞ্জাম তৈরির সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে নিয়েছে।
এই সংকট মোকাবিলায় সৌদি আরব গত ৩০ জুলাই তুরস্ক, পাকিস্তান, মিসর, সুদান ও জিবুতিসহ ১৪টি দেশকে নিয়ে লোহিত সাগরে একটি যৌথ নৌ জোট গঠনের ঘোষণা দেয়। এরপর মক্কায় পাকিস্তান ও তুরস্কের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ক্রাউন প্রিন্স একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তবে এসব সামরিক জোটের কার্যকারিতা নিয়ে শুরু থেকেই সংশয় দেখা দিয়েছে। হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা এই নতুন জোটের জন্য প্রথম বড় অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার ফলাফল এখন পর্যন্ত হতাশাজনক।
সৌদি আরব যুদ্ধের অধিকাংশ সময় লোহিত সাগরের বন্দরগুলো ব্যবহার করে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারে সরবরাহ করে আসছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে হুতিরা যদি মোখা ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, তবে তা সৌদি সরকারের জন্য বড় কৌশলগত পরাজয় ডেকে আনবে। একইসঙ্গে এটি দেশটির সরকারি বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিভেদকে আরও উসকে দিতে পারে।
সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কারণ হুতিরা এখন সোমালিয়া ও সুদানের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করছে, যা পুরো হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়। ওয়াশিংটনের বর্তমান অস্থিতিশীল পররাষ্ট্রনীতির কারণে সৌদি আরব নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য বহুপক্ষীয় জোটের ওপর জোর দিচ্ছে। গত ২৮ জুলাই হুতি-অনুগত ইরাকি মিলিশিয়াদের ওপর সৌদি ও মার্কিন বাহিনীর যৌথ হামলা ইঙ্গিত দেয় যে, বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র রিয়াদের পাশে দাঁড়াতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন কোনো সামরিক জটিলতায় জড়াতে অনিচ্ছুক হওয়ায় সৌদি আরবকে এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
পরিশেষে, শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে হুতিদের দমানো সম্ভব নয় বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। স্থলভাগের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকার যদি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারে, তবে হুতিদের এই নতুন রণকৌশল মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতিকে আরও বড় ঝুঁকিতে ফেলবে। ইরান ও তার মিত্রদের লক্ষ্য এখন বাব আল-মানদেব ও হরমুজ—এই উভয় সমুদ্রপথের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এই কৌশল সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল আকার ধারণ করবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মঙ্গলবার ইরানপন্থী এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি সৌদি আরবে একযোগে একঝাঁক ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে এই বন্দর এবং পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় হুতিরা এখন কৌশলগত এই প্রণালির নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হতে পারছে, যা তাদের জন্য আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টির পথ আরও সহজ করে দেবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জুলাই মাসে সৌদি স্বার্থে আঘাত হানার মাধ্যমে হুতিরা যে তৎপরতা শুরু করেছিল, তার প্রভাব বেশ সুদূরপ্রসারী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইরানি কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে ইয়েমেনের ওপর অবরোধ তুলতে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যার সহজ অর্থ হলো, রাজধানী সানাসহ হুতি–নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ওপর থেকে সৌদি আরবের যাবতীয় যাতায়াত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইয়েমেন সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া বন্ধ করা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হুতিদের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় হাতে থাকা বিকল্পগুলো দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হুতিদের পুরোপুরি দমন করা সম্ভব নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হুতিদের এই সামরিক সাফল্য একটি কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমঝোতার সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
















