মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কিউবার বর্তমান সরকার ভেঙে পড়বে এবং দ্বীপটিতে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন। তার এ মন্তব্যের পর কিউবার পাশে থাকার আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার করেছে চীন। সোমবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এই প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। এদিন চীন ও কিউবার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৬৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে তিনি বলেন, বেইজিং কিউবাকে তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দেশের নিজস্ব পরিস্থিতির উপযোগী উন্নয়নের পথ অনুসরণে সব ধরনের সমর্থন দিয়ে যাবে। এর আগে গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণে ট্রাম্প কিউবাকে ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থ রাষ্ট্র’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের দোরগোড়ায় ‘বিদেশি প্রতিপক্ষদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তীব্র অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকট
কিউবা বর্তমানে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র জ্বালানি ও খাদ্যসংকট চলছে এবং ঘন ঘন দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে। কয়েক দশকের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থায়ন, জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করা দেশটির জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এই সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত বছর কিউবার আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৬ শতাংশ এসেছিল ভেনিজুয়েলা ও মেক্সিকো থেকে, তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তেল সরবরাহ বন্ধ হয় এবং কিউবায় জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর মার্কিন শুল্ক আরোপের হুমকির মুখে মেক্সিকোও সরবরাহ স্থগিত রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভ্যন্তরীণ কম উৎপাদন, আমদানিনির্ভরতা এবং পুরোনো জ্বালানি অবকাঠামো।
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও মার্কিন নির্বাহী আদেশ
ট্রাম্পের শাসনামলে কিউবার ওপর মার্কিন চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জারি করা এক নির্বাহী আদেশে তিনি হাভানার নীতিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির জন্য ‘অস্বাভাবিক ও অসাধারণ হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ওই আদেশে অভিযোগ করা হয়, রাশিয়া, চীন ও ইরানের পাশাপাশি হামাস ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে হাভানা তাদের সমর্থন দিচ্ছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, কিউবায় গণতন্ত্র ও বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা এবং কথিত এসব হুমকি মোকাবিলাই তাদের বর্তমান নীতির মূল লক্ষ্য। তবে কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, অর্থনৈতিক সংকট তীব্র করে রাজনৈতিক পরিবর্তন চাপিয়ে দেয়াই মার্কিন চাপের মূল উদ্দেশ্য। হাভানা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘বহুমাত্রিক’ অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালানোর অভিযোগ করেছে এবং দেশটিতে জ্বালানি সরবরাহে বিধিনিষেধ আরোপকে ‘জ্বালানি অবরোধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। শনিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ এসব পদক্ষেপকে নৌ অবরোধের সঙ্গে তুলনা করে একে ‘যুদ্ধের কর্মকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেন। কিউবার ভাষ্য, দেশটিতে জ্বালানি সরবরাহে অন্য দেশগুলোকে নিরুৎসাহিত করার জন্য নেয়া বিধিনিষেধ কার্যত একটি ‘জ্বালানি অবরোধ’।
চীনের কৌশলগত অবস্থান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চীন কিউবার প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। শনিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং কিউবার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের হুমকি অবিলম্বে বন্ধ এবং সকল অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেয়ার আহ্বান জানান। চীন কিউবায় সৌরবিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণেও বড় ভূমিকা রাখছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কিউবার দৈনিক গড় বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ২ শতাংশ এসেছিল সৌরবিদ্যুৎ থেকে, তবে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেলের তথ্য অনুযায়ী, বেইজিংয়ের কারিগরি সহায়তা ও অর্থায়নের ফলে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ তা মোট উৎপাদনের ২১ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া জরুরি খাদ্য সহায়তা এবং ঋণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে কিউবার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড রক্ষায় চীন সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। এই নীতি অনুযায়ী চীন সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে আসছে এবং বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। চীন এমন একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আরও বেশি সার্বভৌম সমতা থাকবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতামতের গুরুত্ব বাড়বে।
















