নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হয়েছে এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বাংলাদেশের বিশাল ভোক্তাবাজারের জন্য মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি প্রচুর কনজিউমার বা ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়। দেশটি শুরু থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে আগ্রহী ছিল।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ডলার, যার বড় অংশই ভোজ্যতেল। বিপরীতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ৩০ থেকে ৪০ কোটি ডলার। আনোয়ার শহীদের মতে, এই বড় ধরনের বাণিজ্যঘাটতি কমিয়ে আনতে রপ্তানি পণ্যের পরিসর বাড়ানো জরুরি। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ফলমূল, শাকসবজি এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য পাঠানোর বিশাল সুযোগ থাকলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে আমরা সেই বাজার ধরতে পারছি না। তাঁদের কথা চিন্তা করলেও তো একটা বড় বাজার তৈরি হওয়ার কথা। বর্তমানে প্রাণসহ কিছু প্রতিষ্ঠান যা রপ্তানি করছে, তা অনেকটাই সেখানকার স্থানীয় কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্পর্কে তিনি জানান, সেখানে টেলিকম, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ ও অটোমোবাইল খাতে দেশটির বিনিয়োগ রয়েছে। রবি আজিয়াটার মতো বড় কোম্পানি সেখানে কাজ করছে। তবে উল্লেখযোগ্য সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এখনো আসেনি। ভবিষ্যতে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও হালাল পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, প্রাণ, মুন্নু সিরামিকস ও আকিজ গ্রুপের মতো কোম্পানিগুলো মালয়েশিয়ায় সিরামিকস ও খাদ্যপণ্য রপ্তানি করছে। এমনকি অনেক বাংলাদেশি ব্যক্তি উদ্যোগে সেখানে জমি ইজারা নিয়ে কৃষিকাজ ও গবাদিপশু পালন করছেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কহার বেশি।
রপ্তানি না বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে ব্যবসায়ী মহল উচ্চ শুল্ক হারের অভিযোগ করলেও, আনোয়ার শহীদ মনে করেন এটি একমাত্র বাধা নয়; বরং নতুন পণ্য খুঁজে বের করার মানসিকতা ও উদ্যোগের অভাবই আসল সমস্যা। তিনি জানান, মালয়েশিয়ায় বসবাসরত ৮ থেকে ১০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির চাহিদাও স্থানীয়ভাবে পূরণ করার সক্ষমতা আমাদের নেই। যদি এই প্রবাসীদের প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও শাকসবজি সরবরাহ নিশ্চিত করা যেত, তবে রপ্তানি কয়েক মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেত।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে ভারতসহ বিশ্বের ৩৪টি দেশের এমন চুক্তি রয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের অনাগ্রহের কারণে দীর্ঘ সময় এই চুক্তি থমকে থাকলেও বর্তমান সরকার বিষয়টি গুরুত্বসহ দেখছে এবং বর্তমানে শর্তাবলি চূড়ান্তকরণের আলোচনা চলছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাণিজ্যিক সুবিধা ধরে রাখতে এই চুক্তি এখন অপরিহার্য। রাজস্ব কমার আশঙ্কায় তারা বিষয়টি তখন নাকচ করে দিয়েছিল। আশা করা যায়, খুব দ্রুতই এফটিএ স্বাক্ষর হবে।
বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, ঘন ঘন পরিবর্তনশীল কর কাঠামো ও নীতিগত অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। এছাড়া দক্ষ জনবলের ঘাটতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি এখনো বড় সমস্যা। গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্তমান সংকট রপ্তানিমুখী শিল্পের অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদেশি ক্রেতাদের মনে আস্থার অভাব তৈরি করছে।
বিশ্বের তিন ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল অর্থনীতির বাজারে মালয়েশিয়া শীর্ষস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে আছে। আনোয়ার শহীদ জানান, হালাল সনদ বা সার্টিফিকেশন নিয়ে বড় সংকট রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআই সনদ দিলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পুরো সাপ্লাই চেইন তদারকির সক্ষমতা আমাদের নেই। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ববাজারে বড় অংশ দখল করতে হলে সরকারকে হালাল পণ্যের জন্য দ্রুত একটি সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী সনদ প্রদান কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
















