বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আর্থিক সংকট নিরসনে জ্বালানি বিভাগে একটি চিঠি পাঠানো হয় গত ৮ সেপ্টেম্বর। সেখানে সংস্থাটির লোকসানের পেছনে দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত দাম সমন্বয় না করা এবং দ্বিতীয়ত, ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে পেট্রোলিয়াম পণ্যের শুল্কায়ন পদ্ধতিতে আনা পরিবর্তন।
বিপিসির ভাষ্যমতে, নতুন শুল্কায়ন পদ্ধতির কারণে প্রতি লিটার জ্বালানি তেলে করের বোঝা আগের তুলনায় প্রায় ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের জুনের আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নির্ধারিত ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে প্রতি লিটার তেল আমদানিতে ১৬ দশমিক ৭৬ টাকা শুল্ক-কর গুনতে হতো। অথচ বর্তমানে ইনভয়েস মূল্যের ভিত্তিতে শুল্ক হিসাবায়নের ফলে গত মার্চ মাসে প্রতি লিটারে ৩৮ দশমিক ৬৪ টাকা ও এপ্রিলে ৩৮ দশমিক ৯০ টাকা কর দিতে হয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার পর জুলাইয়ে তা ২৯ দশমিক ৭৪ টাকায় নামলেও আগস্টে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৪৪ টাকা এবং সেপ্টেম্বর মাসে তা ৩৮ থেকে ৪০ টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিপিসি সরকারের কাছে বেশ কিছু প্রস্তাব রেখেছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিতর্কিত প্রস্তাবটি ছিল দেশের বাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে লোকসান পোষানো। দুর্ভাগ্যবশত, সরকার জনজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব উপেক্ষা করেই গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। বর্তমান সরকারের আমলে গত সাত মাসে তিন দফায় দফায় এই মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। যার ফলে সামগ্রিকভাবে ডিজেলের দাম ৩৫ টাকা, কেরোসিন ৪৩ টাকা, পেট্রোল ৪৪ টাকা এবং অকটেন ৪৫ টাকা বেড়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন খাতের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। সরকার কিলোমিটারপ্রতি বাসের ভাড়া ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেও অনেক ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এছাড়া বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকরা কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ‘ফুয়েল সারচার্জ’ আরোপ করেছে, যা সামগ্রিক ব্যবসায়িক খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কৃষি খাত এই মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি বড় ভুক্তভোগী। দেশে ব্যবহৃত মোট ডিজেলের প্রায় ২৪ শতাংশ বা ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন কৃষিকাজে ব্যয় হয়। ডিজেলের বাড়তি দাম কৃষকের সেচ খরচসহ সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্যপণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে, অথচ সেই অনুপাতে সাধারণ মানুষের আয় বাড়ছে না, বরং অর্থনীতির গতি থমকে আছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জ্বালানির দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরতে বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে আনা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে ভারতের কলকাতার উদাহরণ দিয়ে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা বলা হলেও বাস্তবে সেপ্টেম্বর মাসে সেখানে দাম ছিল ৯৯ দশমিক ৮২ ভারতীয় রুপি। এমনকি দিল্লির মতো শহরেও ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ৯৫ দশমিক ২০ রুপির আশেপাশে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১৯ টাকা ৯৫ পয়সা। অথচ দিল্লিতে ন্যূনতম মজুরি ২৩ হাজার ২৫৪ টাকা, যা বাংলাদেশের পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরির প্রায় দ্বিগুণ। জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ক্রয়ক্ষমতার এ বিরাট পার্থক্যের পরও বাংলাদেশ সরকার জনগণের ওপর সরাসরি মূল্যবৃদ্ধির দায় চাপিয়ে দিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দাম ২০ টাকা বাড়লে বিপিসির লোকসান বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমবে। তবে একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল, বোয়িং ও যুদ্ধবিমান কেনা এবং বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। সরকারের এসব সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দেয় যে, প্রকৃত সমস্যা কেবল ব্যয় সাশ্রয় নয়, বরং সরকারি খরচের অগ্রাধিকারের জায়গাটিই এখানে মুখ্য।
জনস্বার্থ রক্ষা করতে হলে জ্বালানি তেলের, বিশেষত ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা জরুরি। ব্যয় সাশ্রয় করতে হলে সরকারকে অনাবশ্যক প্রকল্প পরিহার করে অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কৌশলগত পণ্য হিসেবে জ্বালানি তেলের বাড়তি খরচ সরাসরি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। জনগণের ওপর করের বোঝা বা দামের চাপ না বাড়িয়ে শুল্ক-কর কমানোর মতো বিকল্প পথ অবলম্বন করা সম্ভব ছিল, যা বিশ্বের অনেক দেশই সংকটের সময় করে থাকে।
পরিশেষে, সরকার কার স্বার্থকে কতটুকু প্রাধান্য দিচ্ছে—তা আজ জনমনে বড় প্রশ্ন। জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত পরিবহন, কৃষি ও শিল্পের মতো মৌলিক খাতগুলোকে রক্ষা করতে হলে জনমুখী পদক্ষেপই একমাত্র পথ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সারা দিনই থেমে থেমে বৃষ্টির আভাস, কমবে কাল থেকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে আটক ৬২৪। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশ্লেষণ / ১০০ বছর পর আবারও ভাঙছে যুক্তরাজ্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেন রিয়াল মাদ্রিদে না গিয়ে বার্সেলোনাকে বেছে নিলেন, জানালেন রদ্রি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রথম কারণটি সরকারের দিক থেকে বেশ ফলাও করে প্রচার করা হলেও দ্বিতীয় কারণটি তুলনামূলক কম আলোচিত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এছাড়া চলমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে মওকুফের প্রস্তাবও ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যায়।
















