সাংবাদিকদের নিবন্ধন, শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা চেয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব পেশ করেছে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল। এছাড়া শাস্তি হিসেবে সাংবাদিকদের আর্থিক জরিমানা করার বিধানসহ মোট ১৯টি নতুন এখতিয়ার আইনে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একটি সভায় এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। অবশ্য প্রতিবেদনটি নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে এখনো আলোচনা হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত আইন সংশোধন করা হয়নি।
প্রেস কাউন্সিলের সচিব মো. আবদুস সবুরের সই করা এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭৪ সালে প্রণীত প্রেস কাউন্সিল আইনটি বর্তমান সময়ের আধুনিক ও স্মার্ট গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা বা অপসাংবাদিকতা রোধে যথেষ্ট নয়। তাই আইনটি যুগোপযোগী করে সেখানে কাউন্সিলের ক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত ১৯টি ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে কাউন্সিলের আওতায় আনা, সাংবাদিকদের জন্য আচরণবিধি তৈরি ও বাধ্যতামূলক করা এবং সংবাদপত্রের প্রচার সংখ্যার ভিত্তিতে প্রেস কাউন্সিলের জন্য লেভি বা চাঁদা আদায়ের ব্যবস্থা। এর একটি ছিল ‘বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সার্বিক কার্যক্রম আরও গতিশীল ও গণমুখীকরণের লক্ষ্যে সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা’। প্রেস কাউন্সিলের ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমান অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত ও স্মার্ট, আধুনিক গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা, মানোন্নয়ন, মান সংরক্ষণসহ অপসাংবাদিকতা ও অপপ্রচার প্রতিরোধে ১৯৭৪ সালের প্রেক্ষাপটে প্রণীত দ্য প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্ট। ২০২২ সালের জুনে সংশোধনীর খসড়া মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রথমে ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান প্রস্তাব করা হলেও মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদনের সময় টাকার পরিমাণ বাদ দেওয়া হয়।
প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়, জাতীয় অখণ্ডতা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ববিরোধী বা জনস্বার্থের পরিপন্থী কোনো সংবাদ বা গুজব প্রকাশিত হলে প্রেস কাউন্সিল স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আদেশ দিতে পারবে। এছাড়া স্বাধীন সাংবাদিকতায় বাধা বা হামলার ঘটনায় সংক্ষুব্ধ পক্ষ অভিযোগ জানালে বা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে কাউন্সিল নিরাপত্তা প্রদানের নির্দেশ দিতে সক্ষম হবে। অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রথমে সংশ্লিষ্ট সম্পাদকের মাধ্যমে আলোচনার সুযোগ দেওয়ার বিধান রাখার কথাও বলা হয়েছে।
প্রেস কাউন্সিল নিজেদের একটি আধা-বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে জানায়, সাংবাদিকদের পেশাগত অসদাচরণের বিচার করতে জেলা জজ মর্যাদার একজনকে কাউন্সিলের সদস্য করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, একাধিক পেশায় নিয়োজিত সাংবাদিকদের বিষয়টিকে নৈতিকতার লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা আইনে স্পষ্ট করার দাবি জানানো হয়েছে।
তবে প্রেস কাউন্সিলের এই প্রস্তাবের কঠোর সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনরা। সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদের মতে, প্রেস কাউন্সিল একটি সরকারি সংস্থা হওয়া সত্ত্বেও একে বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা বিভ্রান্তিকর। তিনি বলেন, সরকারি সংস্থা হিসেবে স্বপ্রণোদিত হয়ে আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা তাদের থাকতে পারে না। এ ধরনের উদ্যোগ স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেকে এই প্রতিষ্ঠানকে ঠুঁটো জগন্নাথ বলে মনে করেন।
নোয়াবের সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, স্বপ্রণোদিত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হলে আইনি কাঠামোর আর প্রয়োজন থাকে না। এটি গণতান্ত্রিক চর্চা ও মুক্ত সাংবাদিকতার পরিপন্থী। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও একই ধরনের আইন সংশোধনের চেষ্টা করা হয়েছিল, যা তখনো কঠোরভাবে সমালোচিত হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যেসব ক্ষমতা কাউন্সিলের হাতে রয়েছে, সেগুলোই তারা সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারে না, অথচ এখন বাড়তি ক্ষমতার দাবি তোলা দুর্ভাগ্যজনক।
উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলেও আইন সংশোধনের মাধ্যমে অর্থদণ্ড ও স্বপ্রণোদিত তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াবসহ বিভিন্ন পক্ষ এর বিরোধিতা করে বলেছিল, এই আইনের বিধান অস্পষ্ট এবং অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্বের জন্য হানিকর’ সংবাদের সঠিক সংজ্ঞা না থাকায় তা সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধে ব্যবহৃত হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। এখনকার নতুন প্রস্তাবনাটি সেই পুরনো চেষ্টারই পুনরাবৃত্তি বলে ধারণা করছেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা।















