Monday , 12 October 2026 | [bangla_date]
  1. অন্যান্য
  2. আন্তর্জাতিক
  3. ই-পেপার
  4. খেলা
  5. জনপ্রিয়
  6. জাতীয়
  7. দুর্যোগ
  8. দেশের খবর
  9. বাণিজ্য
  10. বিনোদন
  11. রাজনীতি

ইয়েমেনে নতুন সংঘাতে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে সৌদি আরব

প্রতিবেদক

October 12, 2026 8:12 am

দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের যুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে উন্নয়ন, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে মনোযোগী হতে চেয়েছিল সৌদি আরব। তবে ইয়েমেনের পরিস্থিতির অবনতি দেশটির এই বড় পরিকল্পনাকে এখন গুরুতর নিরাপত্তা হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা রিয়াদের তেল অবকাঠামো ও বিভিন্ন শহরকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। আবুধাবির অধীনে দীর্ঘদিন লড়াই করা হাজারো যোদ্ধাও সৌদির নতুন কৌশলের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেননি। এতে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তেলের দাম বেড়ে যায়।

প্রায় ১১ বছর ধরে সামরিক অভিযান ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ইয়েমেনের সংঘাত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে আসছে রিয়াদ। যদিও তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল, তবে চলতি গ্রীষ্মে গৃহযুদ্ধ ফের তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত মাসে এই সংঘাতের মাত্রা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।

এই সংকটের পেছনে সৌদি আরবের কিছু কৌশলগত ভুলকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সম্পর্কে টানাপোড়েন এবং ইয়েমেনে নিজেদের সামরিক অবস্থান দুর্বল হওয়া বড় প্রভাব ফেলেছে। দক্ষিণ ইয়েমেনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, ইউএইর সেনারা দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করেনি। আমিরাতি বাহিনীর কমান্ড ব্যবস্থা দক্ষ থাকলেও সৌদি আরব তার কার্যকর কোনো বিকল্প গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে ক্ষমতার একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের ধারাবাহিক কিছু ভুল হিসাব-নিকাশ বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ইয়েমেনে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়াকে কেন্দ্র করে গত বছরের শেষ দিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বে ফাটল দেখা দেয়।

ইউএইর সঙ্গে জোটের ফাটলের সূত্রপাত ঘটে গত বছর, যখন ইয়েমেনে আমিরাতি সামরিক যানে ভুলবশত সৌদি যুদ্ধবিমান হামলা চালায়। এর জের ধরে আবুধাবি সেখান থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয় এবং সৌদির সামরিক কৌশল বড় ধাক্কা খায়। হুতিরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা দেয় এবং বাব আল-মানদেব প্রণালিসহ কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ২০২২ সালের পর ইয়েমেনের এটিই সবচেয়ে বড় সংঘাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় রিয়াদকে এখন অন্য দেশগুলোর দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। গত মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কায়রোতে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠক করেন। এছাড়া আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি ইউএইর ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে রিয়াদে আমন্ত্রণ জানান। একই সঙ্গে ফ্রান্স সামরিক কর্মী ও সরঞ্জাম পাঠাতে সম্মত হয়েছে এবং যুক্তরাজ্য যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহের জন্য উড়োজাহাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ এবং লোহিত সাগরের ইয়েমেন উপকূলজুড়ে অভিযান শুরু করে তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার ক্ষেত্রেও রিয়াদ হতাশ বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও ১০০ জনের বেশি মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা সৌদি আরবে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করছেন, তবুও বড় কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে ট্রাম্প প্রশাসন রাজি হয়নি। সিএনএনের তথ্যানুযায়ী, গত মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুইবার ফোনে কথা বলে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলার অনুরোধ জানালেও ট্রাম্প তাতে সাড়া দেননি। পাল্টা জবাবে সৌদি বাহিনীও হুতিদের লক্ষ্য করে শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার খেসারত।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি জানান, হুতিদের এই আকস্মিক হামলার জন্য রিয়াদ মোটেও প্রস্তুত ছিল না। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের অভাবে অনেক অঞ্চল হাতছাড়া হয়েছে, যা বাহিনীর মনোবল কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে হুতিদের হাতে থাকা উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র এখন সরাসরি সৌদি ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম।

সাম্প্রতিক এক হামলায় সৌদি আরবে দুইজন নিহত হয়েছেন এবং চারজন বাংলাদেশি আহত হয়ে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া এই সংকটের জেরে বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার প্রবাসী ঢাকায় আটকা পড়েছেন। এদিকে গত সোমবার রিয়াদে জরুরি বৈঠকের পর সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করতে একমত হয়েছে।

ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমাইসি মনে করেন, সামরিক সাফল্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো জোটের ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে ফেলা এবং একটি একক কমান্ড সেন্টার তৈরি করা। তিনি সতর্ক করে বলেন, হুতিদের কাছ থেকে অঞ্চল উদ্ধার করলেই হবে না, বরং তা ধরে রাখার সক্ষমতাও সৌদি-সমর্থিত সরকারকে তৈরি করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়েমেনের এই অস্থিরতা এখন সরাসরি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বড় ভূ-রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা বাড়লে সৌদি আরবে চাপ প্রয়োগের জন্য হুতিদের ব্যবহার করার সুযোগ ইরানের আরও বাড়বে। ফলে সামরিক অভিযান জোরদার করা বা ইরানের সঙ্গে নতুন কোনো কূটনৈতিক বোঝাপড়ায় যাওয়া—দুই পথেই সৌদি আরবকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।

সবশেষে, ইয়েমেন সংকটের কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সমাধান না আসায় রিয়াদের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলো ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সামরিক সাফল্য সাময়িক হলেও এর স্থায়ী সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত, যা সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনার জন্য বড় এক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সর্বশেষ - আন্তর্জাতিক

সর্বোচ্চ পঠিত - আন্তর্জাতিক