একটি মুরগির পালক একের পর এক উপড়ে ফেলার মতো করেই দীর্ঘদিন ধরে ভারতে ছোট ছোট অনিয়ম ও অন্যায়ের চর্চা চলেছে। অনেকেই ভেবেছিলেন, এসবের প্রভাব কখনো সামনে আসবে না। কিন্তু এখন সেই সব লুকানো সত্য এক নিমেষে প্রকাশ হয়ে পড়ছে, যা অস্বীকার করার আর কোনো উপায় নেই। ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে মনে হয়, যেন সেই পালকবিহীন মুরগির মতোই রাষ্ট্রযন্ত্র এক অসহায় অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। প্রবাদ আছে, যদি একটি মুরগির গায়ের পালক এক এক করে উপড়ে ফেলা হয়, তবে চট করে কেউ তা টের পায় না। অনেকেই এই বিভ্রান্তিতে ভোগেন যে ছোট ছোট অন্যায় বা অনিয়ম হয়তো কখনোই তাঁদের পেছনে তাড়া করে ফিরবে না। কিন্তু এই কৌশলের প্রধান সমস্যা হলো, এক সুন্দর সকালে সব সত্য কোনো রকম ঢাক ঢাক গুড় গুড় ছাড়াই একদম উলঙ্গ রূপ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়, যা আর অস্বীকার করার কোনো উপায় থাকে না। বিক্ষোভকারীরা কৌতুক করে নিজেদের ‘ককরোচ’ বলে ডাকছেন, তাঁরা আজ ভারতের রাজপথজুড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে এসেছেন।
নরেন্দ্র মোদি বর্তমানে এক গভীর সংকটে পড়েছেন। তিনি সেনা ও পুলিশের ব্যারিকেডের আড়ালে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছেন। যে তরুণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে তিনি পড়েছেন, তাদের হারানোর আর কিছু নেই। ১২ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে গণতান্ত্রিক কাঠামো ক্ষুণ্ণ করার যে প্রক্রিয়া চলে আসছে, তারই চরম পরিণতি এই বিক্ষোভ। ১০ অক্টোবর ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ আয়োজিত হয়, যা মোদির রাজনৈতিক ভুলগুলোকে জনসমক্ষে আরও স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করেছে। নরেন্দ্র মোদি নিজেকে আজ যেভাবে কোণঠাসা অবস্থায় আবিষ্কার করেছেন, সেনা-পুলিশের ব্যারিকেডের আড়ালে আত্মরক্ষা করছেন এবং যে তরুণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখোমুখি হচ্ছেন—যাঁদের কাছে গণতন্ত্রের এই তিলে তিলে ধ্বংসের পর হারানোর আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, ভয় পাওয়ারও কিছু। 12. ভোটার তালিকা থেকে নাম ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ১০ অক্টোবর আয়োজিত বিশাল এক বিক্ষোভের মুখোমুখি হয়ে মোদি নিজের ভুলগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছেন।
বিক্ষোভ দমনে পুলিশ দিনভর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে এক প্রকার ইঁদুর-বিড়াল খেলা খেলেছে। রাজধানী নয়াদিল্লি জুড়ে কোথাও হটিয়ে দেওয়া হলে আন্দোলনকারীরা অন্য প্রান্তে গিয়ে জড়ো হয়েছেন। সরকারবিরোধী এই জনজোয়ার সামলাতে সন্ধ্যা নাগাদ অন্তত ২ হাজার ৫০০ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৫ জন সাংবাদিককে আটক করে বিভিন্ন অস্থায়ী কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। তা সত্ত্বেও হাজার হাজার বিক্ষোভকারী দিল্লির রাজপথে নেমে আসেন এবং নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা চালান।
আন্দোলনের এই উত্তাল দিনে রত্না সিং, অভিজিৎ দিপকে ও ধ্রুব রাঠির মতো পরিচিত মুখদের পাশাপাশি মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীকেও আটক করা হয়। নাগরিক অধিকারকর্মীদের ওপর এই কঠোর দমন-পীড়ন আশির দশকের জরুরি অবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। এর মধ্যেই রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি প্রদান করেছে, যেখানে বর্তমান সরকারের আমলে গণতান্ত্রিক কাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস হওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
সরকারের বিতর্কিত ‘বিশেষ নিবিড় পুনর্বিন্যাস’ বা এসআইআর প্রক্রিয়াকে আমলাতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদের চরম নিদর্শন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ১৩ কোটি ভারতীয় ভোটারের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার পথ প্রশস্ত করা হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার বিতর্কিত ভূমিকা পালন করছেন। এমনকি ২০০৬ সালের পুরোনো একটি দুর্নীতি মামলা নতুন করে সামনে আসার পরও তাঁর পদত্যাগ না করার বিষয়টি বিস্ময় ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। পুরো ভারতজুড়ে একের পর এক শহরে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা গেছে।
মোদি ও তাঁর বয়োবৃদ্ধ মন্ত্রীদের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন বৈচিত্র্যময় এই তরুণ প্রজন্ম। এতদিন ধরে ঘৃণা ছড়ানো ও সমাজকে বিভক্ত করার যে কৌশল সরকার ব্যবহার করে এসেছে, তার বিরুদ্ধে তরুণদের এই অবাধ্যতা স্পষ্ট। আইনপ্রণেতাদের অপরাধপ্রবণ মনোভাব ও অশুভ মূল্যবোধ ভারতের শাসনব্যবস্থাকে সংজ্ঞায়িত করছে, যা তরুণদের মনে সরকারি বাহিনী, পুলিশ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা পুরোপুরি কমিয়ে দিয়েছে।
এটি কেবল একটি দিনের প্রতিবাদ নয়, বরং বহু বছরের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। মোদি নিজেকে দুর্ভেদ্য দুর্গে বন্দি করে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করছেন। এটি তাঁর পুরনো কৌশলেরই অংশ—শান্তির কথা বলে সংঘাত উসকে দেওয়া। ১০ অক্টোবরের এই আন্দোলনকে কেবল শুরু বা সূচনা পর্ব হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। আগামী দিনে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ইতিহাস হয়তো নরেন্দ্র মোদিকে এমন একজন শাসক হিসেবেই চিহ্নিত করবে, যাঁর আমলে একটি পুরো প্রজন্ম গণতন্ত্রের ওপর থেকে আস্থা হারিয়েছে। বর্তমানে নয়াদিল্লি এক দমবন্ধ করা বর্তমান ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ক্রান্তিকালে অবস্থান করছে। তবে এই ঝড়ের ধুলা শান্ত হলে কী হবে, সেই উত্তর কেবল রাজপথে নেমে আসা আজকের এই তরুণরাই জানে। সব ক্ষমতার মূল উৎস যে জনগণ, তা তারা এখন প্রতিটি পদক্ষেপে প্রমাণ করে দিচ্ছে।















